
আনচেলত্তির মাস্টারক্লাসেই হার মানল জাপান
জুলাই ১, ২০২৬
এনবিআরের কাছে ৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চায় চট্টগ্রাম বন্দর
জুলাই ১, ২০২৬প্যারাগুয়ের কাছে জার্মানির ‘লজ্জাজনক’ বিদায় আর মরক্কোর কাছে নেদারল্যান্ডসের যেভাবে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, তাতে ইংল্যান্ড শিবিরে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়াই স্বাভাবিক।
বিশ্বকাপের নকআউটে নামের জৌলুশ, তারকার মেলা কিংবা অতীতের গৌরব কিছুই জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। এ বাস্তবতায় আজ রাত ১০টায় ডিআর কঙ্গোর মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। এ দলটাই গ্রুপ পর্বে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে অনেকটা বোতলবন্দি করে পর্তুগালকে থামিয়ে দিয়েছিল। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা কঙ্গো বলের দখল চায় না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে, রক্ষণকে ইস্পাতের দেয়ালে পরিণত করে। তারপর মুহূর্তের মধ্যে পাল্টা আক্রমণ। এটাই কঙ্গোর ফাঁদ। ঠিক সেই পরীক্ষার মুখেই এবার টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বে ঘানা ও পানামার বিপক্ষে আক্রমণে যে সৃজনশীলতার ঘাটতি চোখে পড়েছে, তা নিয়ে এমনিতেই প্রশ্ন রয়েছে। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিদায়ের পর তাই ইংল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—কঙ্গো-ফাঁদে পড়বে না তো থ্রি লায়নসরা?
সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের কঙ্গোর দর্শন খুব সহজ, প্রথমে গোল না খাওয়া তারপর সুযোগ এলে আঘাত করা। এ দর্শনেই দেসাব্রের চার বছরের দায়িত্বকালে ডিআর কঙ্গো কখনই এক গোলের বেশি ব্যবধানে হারেনি। এ কারণেই কঙ্গোর বিপক্ষে খেলাটা এত কঠিন। তারা বল দখলের জন্য মরিয়া হয় না। বরং ইচ্ছা করেই প্রতিপক্ষকে বল ছেড়ে দেয়। পাঁচ ডিফেন্ডারের দেয়াল, মাঝমাঠে তিন পরিশ্রমী খেলোয়াড়, সামনে দুই ফরওয়ার্ড। প্রতিপক্ষ যত এগোয়, কঙ্গো তত পিছিয়ে যায়। কিন্তু সেটি আত্মসমর্পণ নয়; প্রতিপক্ষকে টেনে আনার কৌশল। একসময় যখন ফুলব্যাকরা ওপরে উঠে যায়, মাঝমাঠ ফাঁকা হতে শুরু করে, তখনই শুরু হয় চিতাবাঘের শিকার।
এ পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচ। বিশ্বকাপ শুরুর আগে অন্যতম ফেভারিট ধরা হচ্ছিল রোনালদোর দলকে। কিন্তু কঙ্গোর বিপক্ষে তারা যেন নিজেদেরই ছায়ায় পরিণত হয়েছিল। অধিনায়ক শঁসেল মবেম্বা ও অ্যাক্সেল তুয়ানজেবের নিখুঁত মার্কিংয়ে রোনালদো কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। পুরো ম্যাচে পর্তুগালের একমাত্র লক্ষ্যে থাকা শটটি আসে ষষ্ঠ মিনিটে জোয়াও নেভেসের হেড থেকে। এরপর দীর্ঘ সময় তারা কঙ্গোর রক্ষণ ভাঙার কোনো পথই খুঁজে পায়নি। পরের ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষেও একই চিত্র। ফল ১-০ ব্যবধানে হার হলেও খেলার চরিত্র বদলায়নি। কলম্বিয়া বেশি বল রাখে, বেশি আক্রমণ করে, কিন্তু প্রতিটি সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে যান গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসি।
প্রয়োজন বুঝে কৌশল বদলাতেও জানেন দেসাব্রে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে তিনি পাঁচ ডিফেন্ডারের বদলে চার ডিফেন্ডারের লাইন ব্যবহার করেন। দুই উইঙ্গার নাথান এমবুকু ও ব্রায়ান সিপেঙ্গাকে নামিয়ে আক্রমণে বাড়তি গতি আনেন। দ্বিতীয়ার্ধে ফিস্টন মায়েলেকে নামিয়ে আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেন। আফ্রিকান ক্লাব ফুটবলের বর্ষসেরা এ ফরওয়ার্ড মাঠে নেমেই ম্যাচের গতি বদলে দেন।
এ কারণেই টমাস টুখেলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল কঙ্গোর রক্ষণ ভাঙা নয়, তাদের ধৈর্যের পরীক্ষা উতরে যাওয়া। কারণ কঙ্গো জানে, ম্যাচ যত দীর্ঘ হবে, প্রতিপক্ষের অস্থিরতাও তত বাড়বে। কঙ্গোর সবচেয়ে বড় আক্রমণাত্মক অস্ত্র ইয়োয়ানে উইসা। তিন ম্যাচে তিন গোল করেছেন। নিউক্যাসল ইউনাইটেডে ৫৫ মিলিয়ন পাউন্ডে যোগ দেয়ার পর যে আত্মবিশ্বাস তিনি পেয়েছেন, সেটির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিশ্বকাপেও। তার পাশে সেড্রিক বাকাম্বু কিংবা বদলি হিসেবে নামা ফিস্টন মায়েলে—দুজনই মুহূর্তের মধ্যে ম্যাচের চিত্র পাল্টে দিতে পারেন। কঙ্গোর শক্তির আরেকটি বড় জায়গা হলো ইংলিশ ফুটবলের সঙ্গে তাদের পরিচয়। অ্যাক্সেল তুয়ানজেবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড একাডেমিতে বড় হয়েছেন। অ্যারন ওয়ান-বিসাকা ইংল্যান্ডের জাতীয় দলের প্রাথমিক দলে ডাকও পেয়েছিলেন। আর্থার মাসুয়াকু দীর্ঘদিন খেলেছেন ওয়েস্ট হামে। অ্যারন শিবোলা অ্যাস্টন ভিলা ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের সাবেক খেলোয়াড়।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের উদ্বেগের জায়গাগুলো এখনো রয়ে গেছে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ৪-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয়ের পর থেকে দলটি যেন ক্রমেই গতি হারিয়েছে। ঘানার বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র, পানামার বিপক্ষে ১ ঘণ্টার বেশি সময় গোলের জন্য সংগ্রাম স্পষ্ট করে দিয়েছে আক্রমণে এখনো কাঙ্ক্ষিত ধার খুঁজে পাচ্ছেন না টমাস টুখেল। জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইনের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দলকে উদ্ধার করেছে বটে টুর্নামেন্ট যত এগোবে, ততই প্রয়োজন হবে আরো বেশি সৃজনশীলতা,গতি ও বৈচিত্র্য।
রক্ষণেও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। ডান প্রান্তে রিস জেমসের চোট টুখেলের পরিকল্পনায় ধাক্কা দিয়েছে। তার পরিবর্তে খেলতে নেমে জ্যারেল কোয়ানসাহও ইনজুরিতে পড়েছেন। ফলে জেড স্পেন্সকে খেলাতে হতে পারে। এমন পরিবর্তনের সুযোগই কাজে লাগাতে চাইবে কঙ্গো।
ইংল্যান্ডের পক্ষেও আশার কারণ কম নয়। ডেকলান রাইসের ফেরার সম্ভাবনা মাঝমাঠকে আরো ভারসাম্য দেবে। কেইনের গোল করার ক্ষমতা, বেলিংহামের বক্সে ঢুকে পড়ার দক্ষতা এবং সাকা কিংবা মাদুয়েকের গতি ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে কঙ্গোর রক্ষণভাগকেও বড় পরীক্ষায় ফেলতে পারে ইংল্যান্ড। টুখেলের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে ধৈর্য না হারানো। কারণ কঙ্গো ঠিক সেটাই চায়—প্রতিপক্ষ যেন তাড়াহুড়ো করে, অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেয়।
ইংল্যান্ড-কঙ্গোর পর একই দিনে আরেকটি ইউরোপ-আফ্রিকা লড়াইও চোখ টানবে। সিয়াটল স্টেডিয়ামে রাত ২টায় মুখোমুখি বেলজিয়াম ও সেনেগাল। এ ম্যাচের আকর্ষণও তাই প্রায় ইংল্যান্ড-কঙ্গো লড়াইয়ের মতোই। বেলজিয়াম কাগজে-কলমে এগিয়ে থাকলেও সেনেগালকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকান ফুটবল বারবার প্রমাণ করেছে, বড় দলের নাম শুনে তারা আর মাঠে নেমে ভয় পায় না। বরং ইউরোপীয় দলগুলোর ধীর বিল্ডআপ, রক্ষণ থেকে বল বের করার ঝুঁকি এবং মাঝমাঠে জায়গা ফেলে রাখার প্রবণতাকে তারা নিজেদের অস্ত্র বানিয়েছে।
বেলজিয়ামের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। তারা যদি ধীর ছন্দে খেলে এবং সেনেগালকে পাল্টা আক্রমণের সুযোগ দেয়, তাহলে বিপদ বাড়বে। বিশেষ করে নকআউটে প্রথম গোলের গুরুত্ব অনেক। সেনেগাল আগে এগিয়ে গেলে ম্যাচটি বেলজিয়ামের জন্য মানসিক ও কৌশলগত দিক থেকে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ তখন আফ্রিকান দলটি আরো নিচে নেমে জায়গা বন্ধ করবে, আর বেলজিয়ামকে ভাঙতে হবে ঘন রক্ষণ।


