ব্যাংক খাতের সংস্কার সরকারি পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে ৭০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
জুন ২৯, ২০২৬
মরদেহ
জুন ২৯, ২০২৬
ব্যাংক খাতের সংস্কার সরকারি পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে ৭০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
জুন ২৯, ২০২৬
মরদেহ
জুন ২৯, ২০২৬

তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ মফস্বলের জনজীবন

বাড়তি লোড চায় পল্লী বিদ্যুৎ, জ্বালানি সংকটে বাড়ানো যাচ্ছে না উৎপাদন

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বর্তমানে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের ওপর প্রাক্কলন করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এর বিপরীতে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) বিদ্যুৎ সরবরাহ সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি।

চাহিদা ও সরবরাহের বিপরীতে অন্তত আড়াই-তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। রাজধানী ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও মফস্বল শহর থেকে গ্রামে লোডশেডিং পৌঁছেছে অসহনীয় পর্যায়ে। চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে রাতের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা আরো কিছু বেড়েছে বলে বেশ কয়েকটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে লোডশেডিং সামাল দিতে লোড বাড়ানোর কথা জানিয়ে সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসিকে চিঠিও দিয়েছে অনেক অঞ্চলের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

তবে এ পরিস্থিতি যে বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমনটি নয়, বরং গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় কয়েক সপ্তাহ ধরেই এ অবস্থা চলছে। এতে ঢাকার বাইরে ১২-১৪ ঘণ্টার মতো লোডশেডিংয়ের কথা জানিয়েছেন বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রাহক।

এদিকে বিদ্যুতের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকার অন্যতম কারণ জ্বালানি সংকট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত জ্বালানির সংস্থান না থাকা, আবার তেলভিত্তিক কেন্দ্রের বকেয়া, জ্বালানি আমদানিতে বেসরকারি মালিকানাভিত্তিক কেন্দ্রের অর্থ সংকটের কারণে বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব নয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এর পরও লোডশেডিং কমিয়ে আনতে গতকাল পেট্রোবাংলার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিপিডিবি ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে মূলত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ কীভাবে বাড়ানো যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে গ্যাসের জোগান কিছুটা বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হয় বৈঠকে। সেই সঙ্গে জ্বালানি সংকটে থাকা কেন্দ্রগুলোর বিল বকেয়া, জ্বালানি তেল আমদানির জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লোডশেডিং কমানোর জন্য গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পেট্রোবাংলার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তারা কিছুটা সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। আমাদের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তাতে শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। মফস্বলের কিছু কিছু অঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে। এটা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। উৎপাদন বাড়লে ময়মনসিংহ অঞ্চলে কয়েক দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় আরো কিছুটা উন্নত হবে।’

দেশে গত শনিবার পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) ১৭ হাজার ৬২৫ মেগাওয়াটে ওঠে বিদ্যুতের চাহিদা। বিপিডিবির প্রকৃত উৎপাদনচিত্র থেকে জানা যায়, ওইদিন ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়। সেই হিসাবে লোডশেডিং ছিল ১ হাজার ৯৭৫ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুতের সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য বলছে, শনিবার সারা দেশে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৮৭৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং ছিল ঢাকা বিভাগে, ৫৩৮ মেগাওয়াট।

পাওয়ার গ্রিডের হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ময়মনসিংহে, ৫১৯ মেগাওয়াট। এরপর খুলনায় ৩৭৫, রাজশাহীতে ৩৫২, কুমিল্লায় ৩৪৩, সিলেটে ২৪৭, বরিশালে ১৪২, চট্টগ্রামে ১৬২ ও রংপুর বিভাগে ১৯৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল গত শনিবার।

এদিকে গ্রীষ্মের তীব্র গরমের সঙ্গে ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় চরম ভোগান্তি বেড়েছে মফস্বলে। ব্যাপক হারে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বড় ধরনের লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি হুমকিতে পোলট্রি খাত। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমে গেছে ডিম ও মাংস উৎপাদন।

নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, নাটোরে দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১১০-১২০ মেগাওয়াট। কিন্তু সংস্থাটিকে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে কেবল ৫০-৬০ মেগাওয়াট। রাতে এ চাহিদা ১৩০ মেগাওয়াটের ওপর উঠে যাচ্ছে। এর বিপরীতে মিলছে ৭০-৮০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

নাটোর সদর উপজেলার শিবদুর গ্রামের বাসিন্দা রিজভী আহমেদ বলেন, ‘দিন-রাত মিলিয়ে মাত্র ৮ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। রাতের বেলায় সবচেয়ে ভোগান্তি বাড়ে।’

এ বিষয়ে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার ফখরুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্রীষ্মের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং চলমান বিশ্বকাপ ফুটবলের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছি না। এ কারণে দিনে ও রাতে লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছি। এতে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ায় সমিতিরও কিছু করার নেই আসলে। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বরাদ্দের বিষয় জানিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে এরই মধ্যে চিঠি দেয়া হয়েছে।’

দক্ষিণের জেলা মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে মানুষ অতীষ্ঠ। গ্রাম ঘুল্লিয়ার কলেজছাত্র সুজন মোল্লার সঙ্গে কথা হলে জানান, গরম বেশি থাকলে লোডশেডিং বাড়ে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তারা এখন অতীষ্ঠ। সন্ধ্যার পর আধাঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের ১ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হয়।

অসহনীয় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভাগের অনিয়মের অভিযোগে টাঙ্গাইল, ঝালকাঠি ও ঢাকার দোহারে মানববন্ধন, মহাসড়ক অবরোধ ও বিদ্যুৎ কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। লোডশেডিংয়ে বিশ্বকাপ খেলা দেখতে না পেরে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎ কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ নিজেই জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কারিগরি ত্রুটি ও বঙ্গোপসাগরের উত্তাল আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। ফলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিন গতকাল জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালির ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে তিনি এ তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, ‘একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লারের টিউবে লিকেজ দেখা দেয়ায় কেন্দ্রটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ (ফোর্সড শাটডাউন) করতে হয়েছে। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল আবহাওয়ার কারণে একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ওই কেন্দ্রের একটি ইউনিটও বন্ধ রয়েছে। এ দুই কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে এবং ঢাকাতেও লোডশেডিং করতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *