
বিরোধী দলের এমপিদের বক্তব্য নিয়ে সংসদে হট্টগোল
জুন ২৭, ২০২৬
হামের প্রাদুর্ভাব দেশে শিশুমৃত্যু ৭০০ ছাড়াল
জুন ২৭, ২০২৬দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরের জেলাগুলোয় এবার বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে পেঁয়াজের দামে বড় ধরনের ধস নামায় উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না তারা। এতে প্রতি মণে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনছেন বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন, আবার কেউ ক্ষোভে বাজার থেকে ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রতিবাদে নদীতে এক কৃষকের পেঁয়াজ ফেলে দেয়ার ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ কারণে আগামী মৌসুমে ফসলটির চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন অনেক কৃষক।
কৃষক ও কৃষিসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া এবং হাইব্রিড জাতের আবাদ বৃদ্ধির কারণে এবার কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রাজশাহী ও পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। এর বাইরে নাটোর ও মেহেরপুরেও উৎপাদন বেড়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব জেলা থেকেই দেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে। চলতি মৌসুমে প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করে প্রায় ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। সারা দেশে মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ টন, যেখানে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩৫-৩৬ লাখ টন।
পাবনা এবারো দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী জেলা। সেখানে ৪৫ হাজার ৬৬৫ হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ফরিদপুর, যেখানে প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৬ লাখ টন উৎপাদন হয়েছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি জেলায় স্থাপিত ২৮৫টি মডেল পেঁয়াজ সংরক্ষণ ঘরে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার টন মজুদ রয়েছে পণ্যটি। তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সামনে ধানের আবাদ থাকায় অর্থের প্রয়োজন মেটাতে কৃষকরা এখন সংরক্ষিত পেঁয়াজও বাজারে বিক্রি করছেন।
কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মার্চে যেখানে প্রতি মণ পেঁয়াজের দাম ছিল ১ হাজার টাকার বেশি, সেখানে বর্তমানে মানভেদে দাম নেমে এসেছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায়। অথচ উৎপাদন, পরিচর্যা, সেচ, সার, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার সোনাপুর বাজারে দেখা হয় কৃষক পলাশ মিয়ার সঙ্গে। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে তাকে ভ্যানভর্তি পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দিতে দেখা যায়। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলার সময় দাম ছিল মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা। এখন সেই পেঁয়াজ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।’ বাজারে আনা পেঁয়াজের মান কিছুটা কম হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে ক্ষোভ থেকেই তিন বস্তা, অর্থাৎ প্রায় চার মণ পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেন তিনি।
একই বাজারে কথা হলে কৃষক দিদার হোসেন বলেন, ‘সার, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদনে ৩০-৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে সেই খরচও উঠছে না। লোকসানের পাশাপাশি সংরক্ষণ ব্যয়ও বেড়েছে। পেঁয়াজ ভালো রাখতে সার্বক্ষণিক ফ্যান চালাতে হচ্ছে, এতে বিদ্যুৎ বিলও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সরকার বাজারে হস্তক্ষেপ করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পেঁয়াজের আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন।
কৃষি কর্মকর্তারা অবশ্য আশা করছেন, সময়ের সঙ্গে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এ বিষয়ে রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণাগারের অভাবে দীর্ঘদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পচনের আশঙ্কায় কৃষকরা দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।’ তবে বাজার পরিস্থিতি সামনে উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উৎপাদন পরিকল্পনার অভাব, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা প্রতি বছর একই সংকটের মূল কারণ বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাজেদুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে পরের বছর আবাদ কমে যায়। তখন বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারি পর্যায়ে সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পেঁয়াজ সংগ্রহ এবং বাজার তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।’


