
প্রবাসীদের জন্য টাকাভিত্তিক হিসাব চালুর অনুমোদন দিল বাংলাদেশ ব্যাংক
জুন ২৪, ২০২৬
বগুড়ার সেই তিন ইউপির নাম পরিবর্তনের গণশুনানি
জুন ২৪, ২০২৬বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা এবং তিন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আগাম পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
এরই মধ্যে লালমনিরহাটের তিস্তা নদীতে দ্রুত পানি বেড়ে এরই মধ্যে বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। গতকাল হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর ১২টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানির উচ্চতা ছিল ৫২ মিটার, যা বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ মিটার থেকে ১৫ সেন্টিমিটার নিচে। ৩ ঘণ্টার ব্যবধানে পানি বেড়ে বেলা ৩টায় ৫২ দশমিক ১৬ মিটারে পৌঁছয়।
বন্যা সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারসংলগ্ন এবং সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
নীলফামারী: ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বৃষ্টিপাতের ফলে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডিমলা ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল ভোর ৬টায় বিপৎসীমার পাঁচ সেন্টিমিটার, সকাল ৯টায় ১০ ও দুপুর ১২টায় ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। তবে বেলা ৩টায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে পানি। ওই পয়েন্টে বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার। বর্তমানে পানির উচ্চতা ৫২ দশমিক ১৬ সেন্টিমিটার।
ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান (ভারপ্রাপ্ত) জানান, তিস্তার পানি বাড়ার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা দিশাহারা হয়ে উঁচু জায়গায় যেতে বাধ্য হয়। চর, গ্রামসহ নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করে প্রায় এক হাজার পরিবার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। দ্রুত তাদের পুনর্বাসনের অনুরোধ জানান তিনি।
উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন বলেন, ‘জেলার ডিমলার পূর্ব ছাতনাই, পশ্চিম ছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ি, খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের সাত গ্রামের প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এসব পরিবারের মধ্যে অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরে গেছে।’
এদিকে জলঢাকা উপজেলার ডাউয়াবাড়ি ও শৌলমারী ইউনিয়নের শত শত পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। তিস্তায় পানি বেড়ে যাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট, শাকসবজি, পুকুরের মাছ ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এতে ক্রমেই বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ।
লালমনিরহাট: হাতীবান্ধা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে পানির চাপ সামাল দিতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেয়া হয়েছে। এতে নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উত্তরের চার জেলা রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে চরাঞ্চলের অন্তত ছয় হাজার পরিবার বলে জানিয়েছেন পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব।
এদিকে হঠাৎ করে তিস্তা নদীর পানিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা। তিস্তার পানি বাড়ায় হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান, নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গীমারি, ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি, কালীগঞ্জের শৈলমারী, চর বৈরাতী, রুদ্রেশ্বর, আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন ও স্পারবাধ, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলা, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা চরাঞ্চলের নদীতীরবর্তী চরে বাদামখেত, ধানের বীজতলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষক।
কালীগঞ্জের কাশীরাম এলাকার বাদামচাষী লাকু মিয়া জানান, তিস্তার চরে ৫০ শতক জমি লিজ নিয়ে চিনাবাদাম চাষ করেছেন। কয়েক দিন পানি জমে থাকায় বাদামে পচন ধরেছে এবং গাছ হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার পাশাপাশি লোকসানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ: নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। হাটবাজার, রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। তাহিরপুরের আনোয়ারপুর-সুনামগঞ্জ সড়ক ডুবে চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। মাঠিয়ান হাওরে বাড়িঘরের সামনে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে গেছে। বড়ছড়া সীমান্তে পাহাড়ি ঢলের পানি ঢুকে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। সদর উপজেলার মঙ্গলকাটা বাজারসহ কয়েকটি বাজারে পানি ঢুকে পড়েছে। খাসিয়ামারা নদীর দুকূল উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। এছাড়া সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চল এবং হাওর-তীরবর্তী কয়েকটি গ্রামে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। হঠাৎ পানি বাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম: পানি বাড়তে শুরু করায় তিস্তা-তীরবর্তী চরাঞ্চলের নিচু জমিগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। এতে কৃষকদের মধ্যে ফসলহানির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। উলিপুর উপজেলার থেতরাই ইউনিয়নের চর জুয়ান সতরা এলাকার কৃষক আবদুস ছালাম বলেন, ‘পানি বাড়ার কারণে চরাঞ্চলের নিচু জমিগুলো তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। এতে মরিচ ও পটোলখেত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।’
রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের চর গতিয়াশাম এলাকার কৃষক ছাবেদ আলী বলেন, ‘বাদামখেত তলিয়ে যাওয়ায় তড়িঘড়ি করে বাদাম তুলে নিয়েছেন। তবে পাটখেতসহ অন্যান্য সবজিখেতে এরই মধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে।’
কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘নদ-নদীর পানি বাড়া অব্যাহত থাকলেও সব নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে আছে। তবে চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তিস্তার পানি আরো বেড়ে আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে। (প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বণিক বার্তার নীলফামারী, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের জেলা প্রতিনিধিরা)


