জরিপ প্রতিবেদন জ্বালানি সংকটে বিদ্যুচ্চালিত ব্যবস্থায় ঝুঁকছে বড় কোম্পানিগুলো
জুন ১৮, ২০২৬
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেয়ার অভিযোগ
জুন ১৯, ২০২৬
জরিপ প্রতিবেদন জ্বালানি সংকটে বিদ্যুচ্চালিত ব্যবস্থায় ঝুঁকছে বড় কোম্পানিগুলো
জুন ১৮, ২০২৬
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেয়ার অভিযোগ
জুন ১৯, ২০২৬

ভাঙন-অব্যবস্থাপনায় বেলাভূমি ও সৌন্দর্য হারাচ্ছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত

সাগরকন্যাখ্যাত কুয়াকাটার সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত এ সমুদ্রসৈকত দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। কিন্তু ক্রমেই এ সৈকতের বেলাভূমি ছোট হয়ে আসছে।

উপকূলীয় ভাঙন, পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি আর দূষণ-দখলে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে সৈকতের বেলাভূমি, সৌন্দর্য হারাচ্ছে পুরো সৈকত এলাকা। অন্যদিকে বিপদাপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য, বিভিন্ন অব্যবস্থাপনায় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পর্যটক ও স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন এবং যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রটি দিন দিন শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জলোচ্ছ্বাস, উচ্চ জোয়ার ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৈকতের বিভিন্ন অংশে ভূমিক্ষয় ও ভাঙন বাড়ছে। বঙ্গোপসাগরের তীব্র ঢেউয়ের ঝাপটায় তীরের বালিক্ষয়, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ধ্বংস ও সংরক্ষিত বনের উপকারভোগীদের নির্বিচারে বন নিধন এ উপকূলকে গত কয়েক দশকে বিপন্ন করে তুলেছে। তিন দশকের ব্যবধানে প্রায় আড়াই কিলোমিটার বনভূমি সমুদ্রে বিলীন হয়েছে। বিশেষত ২০১০ সালের পর কুয়াকাটা সৈকত ব্যাপক ভাঙনের কবলে পড়ে। এর পর থেকে দুই হাজার মিটারের বেশি সৈকত এলাকা সাগরে বিলীন হয়েছে। সংকুচিত হয়ে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে জোয়ারের সময় বেলাভূমিতে আর হাঁটার জায়গা থাকে না, পুরোটাই পানির নিচে চলে যায়।

সৈকতকে ভাঙন থেকে রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উদ্যোগে জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। কিন্তু এগুলো সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। সরজমিনে দেখা গেছে, জিও টিউব ও জিও ব্যাগের কারণে বিপজ্জনক ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটকদের জন্য এসব গর্ত যেন মরণফাঁদ। সমুদ্রে জোয়ারের পানিতে গোসলে নেমে জিও ব্যাগের শ্যাওলায় পা পিছলে দুর্ঘটনায় পড়ছে নানা বয়সী মানুষ।

জোয়ার নেমে গেলে পুরো সৈকতে ফুটে ওঠে এক বিধ্বস্ত চেহারা। বিভিন্ন গর্তে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকে। উঁচু-নিচু খাদের কারণে মানুষকে স্বাভাবিক চলাফেরায়ও বেগ পেতে হয়। বিভিন্ন ভাঙা স্থাপনার কংক্রিট, রড ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সৈকতের বিভিন্ন স্থানে। এগুলোতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেরা। জিও ব্যাগের স্তরে কিংবা ভাঙা স্থাপনায় আটকে আছে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন বর্জ্য। পর্যটকরা অনেকেই জোয়ারের সময় প্রথমবার সৈকতে এসে কোনো ধারণা ছাড়াই গোসলে নেমে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তাদের সতর্ক করার জন্য সৈকতে নেই কোনো সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড কিংবা জরুরি চিহ্ন।

b1
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘সৈকতের বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা, গাছপালা ধ্বংস ও পরিবেশের প্রতি উদাসীনতার কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এসব কারণে ধীরে ধীরে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।’

কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন, ‘সৈকত রক্ষায় জিও টিউব ও ব্যাগ ব্যবহার নদী রক্ষার ডিজাইনে করা হচ্ছে। এগুলো সমুদ্র রক্ষার ডিজাইনে করা দরকার। সৈকত রক্ষায় অস্থায়ীভাবে এ পরিকল্পনায় কিছুটা বালিক্ষয় রোধ হচ্ছে। সৈকতের জিরো পয়েন্টে পর্যটকদের ভোগান্তির বিষয়ে প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদন পেলে সৈকত রক্ষা করা সম্ভব হবে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, সৈকত রক্ষায় বিভিন্ন সময় প্রকল্প ও বরাদ্দের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে টেকসই ও দৃশ্যমান উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কুয়াকাটার উপকূল দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘নতুন ব‍্যবস্থাপনা হিসেবে নেদারল্যান্ডসের সৈকত রক্ষার প্রক্রিয়ার মতো করে “‍বিচ নওরিসমেন্ট” প্রকল্প নেয়া যেতে পারে।’

b2
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের ক্রমবর্ধমান ভাঙন রোধে জিও ব্যাগের ব্যবহার সাময়িক উপশম দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হচ্ছে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। জানতে চাইলে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. তরিকুল ইসলাম সজীব বলেন, ‘দুই বছর পরপর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ রিফিল করা হলেও তা ফেটে গিয়ে কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এর স্থায়ী ও সাশ্রয়ী বিকল্প খোঁজা জরুরি। সমুদ্রতীরের ভাঙন রোধে পরিবেশবান্ধব ম্যানগ্রোভ বনায়ন একটি ভালো উদ্যোগ হতে পারে। তবে এটি পর্যটনস্থল হওয়ায় পর্যটকদের বিচরণের স্বার্থে সৈকতজুড়ে এ ধরনের বনায়ন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে একটি বিকল্প হতে পারে ভারতের তামিলনাড়ু বা কর্ণাটকের মতো আধুনিক “‍গ্রোয়েন” বাঁধ। রাজশাহীতে পদ্মা নদীতেও এ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।’

কুয়াকাটা সৈকতের ভাঙন নিয়ে তারা একটি গবেষণা করছেন জানিয়ে ড. মো. তরিকুল ইসলাম সজীব আরো বলেন, ‘চলমান গবেষণার অংশ হিসেবে বর্তমানে জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকূলের তীব্র ভাঙনপ্রবণ “‍হটস্পট”গুলো চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এ সংকট মোকাবেলায় সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি তদারকি ও সমন্বিত গবেষণা বাড়ানো জরুরি। সর্বোপরি উপকূলীয় ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় কমিউনিটিকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন, যাতে তারা প্রকল্পটিকে নিজেদের মনে করে রক্ষা করে।’

উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কুয়াকাটার (উপরা) আহ্বায়ক কে বাচ্চু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ জোর দিতে হবে। পরিকল্পিত উপকূলীয় সুরক্ষা নীতি গ্রহণ না করলে অচিরেই কুয়াকাটার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া কুয়াকাটার সমুদ্র ঘেঁষা বেড়িবাঁধের কিছু পয়েন্ট এখন দৃশ্যমান ঝুঁকির মুখে রয়েছে।’

জানা যায়, স্থায়ীভাবে সৈকত রক্ষায় ‘কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে একটি ডিপিপি প্রক্রিয়াধীন। পাউবোর কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ্ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৭৫৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষ একটি ডিপিপি প্ল্যানিং কমিশনে দাখিল করা আছে, যা আইডব্লিউএস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সমীক্ষা যাচাই করা হয়েছে। ওই প্রকল্পের ডিজাইন নিয়ে বর্তমানে বোর্ডের ডিজাইন দপ্তর কর্তৃক ভেটিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ভেটিং সম্পন্ন হলে সেই ডিজাইন অনুযায়ী পুনরায় ডিপিপি দাখিল করা হবে।’

অন্যদিকে পর্যটকদের জন্য সেবার মানোন্নয়ন, সৈকতের শৃঙ্খলা রক্ষা ও সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয় বলে মত স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্টদের। তাদের দাবি, কুয়াকাটাকে কক্সবাজারের আদলে পর্যটনভিত্তিক একটি ‘একক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের’ আওতায় আনা হোক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়াকাটার আঞ্চলিক অর্থনীতিকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করতে হলে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত বিনিয়োগ। তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কুয়াকাটা কেবল স্থানীয় অর্থনীতি নয়; জাতীয় রাজস্ব খাতেও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

কুয়াকাটা সৈকতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরিবেশ ও পর্যটন খাতের টেকসই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে প্রশাসন। উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। অন্যদিকে স্বল্প সময়ে পরিণত বন তৈরির জাপানি কৌশল অনুসরণ করে জেলার কলাপাড়া উপজেলায় বেদখল হওয়া খাসজমি উদ্ধার করে “‍মিয়াওয়াকি ফরেস্ট” স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা এবং পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করতে কুয়াকাটাসংলগ্ন সাতটি উপজেলাকে কেন্দ্র করে “‍পায়রা-কুয়াকাটা কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান ফোকাসিং অন ইকো-ট্যুরিজম” গ্রহণ করা হয়েছে। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় সরকার এরই মধ্যে “‍অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান”-এর ঘোষণা দিয়েছে।’

কুয়াকাটা সৈকত রক্ষার বিষয়ে পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাড়ে সাতশ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *