কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহত ৫ বাংলাদেশী
জুন ৫, ২০২৬
মার্কিন অবরোধে ইরানের জ্বালানি তেল রফতানিতে বড় ধস
জুন ৫, ২০২৬
কুয়েতে ড্রোন হামলায় আহত ৫ বাংলাদেশী
জুন ৫, ২০২৬
মার্কিন অবরোধে ইরানের জ্বালানি তেল রফতানিতে বড় ধস
জুন ৫, ২০২৬

প্রতিযোগীদের তুলনায় বাড়তি উৎপাদন খরচ বাংলাদেশে চা বাগান ও উৎপাদন বাড়লেও অধরাই থাকছে রফতানি সাফল্য

 

দুই দশক আগেও দেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রফতানি হতো। সময়ের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

তবে পণ্যটি রফতানি নেমে এসেছে উৎপাদনের মাত্র ১ শতাংশে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, রফতানি প্রণোদনা নীতির কিছু শর্ত এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ সামাল দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে সরকারকে। তার মধ্যে অন্যতম কৃত্রিম বাজার তৈরি করা।

চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে চা রফতানিতে ৪ শতাংশ প্রণোদনা চালু করে সরকার। পরে তা কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয় এবং চলতি অর্থবছরে আরো কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আবার প্রণোদনা সুবিধা পেতেও রয়েছে নানা শর্ত। বর্তমান নীতিমালায় বলা আছে, চা রফতানিতে প্রণোদনা পেতে হলে রফতানিকারককে অবশ্যই বাগান মালিক হতে হবে। এ শর্তের কারণে দেশের বেশির ভাগ সম্ভাব্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রণোদনার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো দেশের অধিকাংশ চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্র্যান্ড নেই। বিভিন্ন করপোরেট ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান মূলত নিলাম থেকে চা কিনে বাজারজাত করে। আর বাগান মালিকদের মধ্যে সীমিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেরই কেবল নিজস্ব ব্র্যান্ড ও বিপণন ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে রফতানি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বৃহৎ একটি অংশ প্রণোদনা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করছেন, নীতিগত এ সীমাবদ্ধতার কারণে চা রফতানির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বরং রফতানি কমতে থাকায় দেশে উৎপাদিত অতিরিক্ত চা বাজারজাত করতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণে কৃত্রিমভাবে উদ্যোগ নিতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

চা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ২০০১ সালে দেশে ৫ কোটি ৩১ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়। ওই বছর রফতানি হয়েছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ১০ হাজার কেজি। পরের বছর রফতানি হয়েছিল ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার কেজি, ২০০৩ সালে ১ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার, ২০০৪ সালে ১ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ও ২০০৫ সালে ৯০ লাখ ১ হাজার কেজি।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন বাড়লেও তলানিতে নেমেছে রফতানি। ২০২১ সালে ৯ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার কেজি উৎপাদনের বিপরীতে রফতানি হয় মাত্র ৬ লাখ ৮০ হাজার কেজি। তার পরের বছর ৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার কেজি উৎপাদনের বিপরীতে ৭ লাখ ৮০ হাজার কেজি রফতানি হয়। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হলেও রফতানি দাঁড়ায় ১০ লাখ ৪ হাজার কেজিতে। ২০২৪ সালে রফতানি বেড়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার কেজিতে পৌঁছলেও ২০২৫ সালে তা আবার কমে ১৬ লাখ ৪০ হাজার কেজিতে নেমে আসে। ওই বছর উৎপাদন ছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চায়ের বাজার নির্ভর করে ভোক্তার চাহিদার ওপর। দেশীয় বাজার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক থাকলে চায়ের বাজারও চাঙ্গা থাকে। তবে কভিড-১৯ থেকে টানা কয়েক বছর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কারণে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে চা বিপণন বাজারে মন্দা ভাব তৈরি হয়। এতে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে চা বিক্রি করতে বাধ্য হন উৎপাদকরা।

চা শিল্পকে সুরক্ষা দিতে ২০১২ সালে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) আরোপ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। বর্তমানে চা আমদানিতে মোট ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ শুল্ক কার্যকর রয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, উচ্চশুল্কের কারণে আমদানি নিয়ন্ত্রণে এলেও রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাতে উৎপাদন খরচ ও বাজারমূল্যের মধ্যে ভারসাম্যও তৈরি হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে চা খাত অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। খাতটিকে বাঁচিয়ে রাখতে আমদানি বন্ধ হলেও সংকট কাটেনি। বাধ্য হয়ে নিলামে চা বিক্রিতে ফ্লোর প্রাইস বসানো হয়েছে। তাদের মতে, রফতানি বাড়াতে হলে প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘শুধু বাগান মালিক’ হওয়ার শর্ত প্রত্যাহার করা জরুরি।

জানতে চাইলে এমসিসিআই ও বাংলাদেশীয় চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের চা উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি। নিয়মিত শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, আবাসিক শ্রমিকদের সার্বিক দায়িত্ব বহন এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের কারণে উৎপাদন ব্যয় কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে চা খাতের উদ্যোক্তারা নানা সংকটের মধ্যে পড়েছেন। প্রণোদনা প্রাপ্তির সুযোগ থাকলেও রফতানির মতো বাণিজ্য পরিচালনার জন্য নগদ অর্থপ্রবাহের অভাবে বাগান মালিকদের অনেকেই নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।’ তবে রফতানি কম হলেও দেশের ক্রমবর্ধমান চায়ের চাহিদা মেটানোর মাধ্যমে আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান তৈরির কাজটি চা খাতের উদ্যোক্তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যাচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সনাতনী চাষাবাদ পদ্ধতি ও শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে চা উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। অনেক প্রতিযোগী দেশ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যয় কমিয়ে এনেছে। এছাড়া উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকায় উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ঋণ গ্রহণেও নানা জটিলতা তৈরি হয়। ফলে আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (অর্থ ও বাণিজ্য) ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে চায়ের ভোগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। উৎপাদন বাড়লেও তার বড় অংশ অভ্যন্তরীণ বাজারেই ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি কেনিয়া, শ্রীলংকা ও ভারতের মতো দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় কম খরচে চা উৎপাদনে সক্ষম হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠেছে। এর পরও আমরা গতানুগতিক চায়ের পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় চা রফতানির বেশি চেষ্টা করছি।’

প্রণোদনা নীতির সীমাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘বাগান মালিকানার বাধ্যবাধকতার কারণে নিলাম থেকে চা কিনে রফতানি করতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের মধ্যে পর্যাপ্ত প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে চা রফতানি উৎসাহিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।’

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *