সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আজ ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী
মে ৩০, ২০২৬
হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৮ শিশুর মৃত্যু
মে ৩০, ২০২৬নগরীর হালিশহর, বড়পোল, নিউমার্কেট, দেওয়ানহাট, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, বাকলিয়া, চকবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকেই চামড়া সড়কের পাশে ফেলে রেখে যান মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। গতকাল সকালে সড়কে চামড়া পড়ে থাকায় চসিকের ট্রাকে সেগুলো অপসারণ করা শুরু হয়। এছাড়া বিভিন্ন উপজেলা শহরেও বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়েছে
বেশি দামে চামড়া কিনে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে না পেরে সড়কেই ফেলে গেছেন হাজার হাজার পিস চামড়া। চামড়ায় পচন ধরায় গতকাল সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা চামড়া নিয়ে গেছেন ডাম্পিং স্টেশনে। নগরীর আতুড়ার ডিপোসংলগ্ন কয়েক কিলোমিটার এলাকায় বিক্রি না হওয়া বিপুল পরিমাণ চামড়া গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়ে ছিল। তবে চট্টগ্রামে কী পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়েছে সেই তথ্য নেই কোনো সংস্থার কাছে।
নগরীর হালিশহর, বড়পোল, নিউমার্কেট, দেওয়ানহাট, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, বাকলিয়া, চকবাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকেই চামড়া সড়কের পাশে ফেলে রেখে যান মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে গতকাল সকালে সড়কে চামড়া পড়ে থাকায় চসিকের ট্রাকে সেগুলো অপসারণ করা শুরু হয়। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত সব চামড়া অপসারণ করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে বিভিন্ন উপজেলা শহরেও অনেক চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গতকাল সকালে পোর্ট কানেক্টিং রোডে বড়পোল এলাকায় সড়ক থেকে সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে নিয়ে যায় দুই শতাধিক পচা চামড়া। গতকাল থেকে চেষ্টা করা হলেও সেগুলো বিক্রি হয়নি। স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার আরো চামড়া ছিল। ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় এসব চামড়া কিনেছেন তিন-চারজন মিলে। আতুড়ার ডিপোতে নিয়ে গিয়েও বিক্রি করতে পারেননি। পরে এসব চামড়া এখানেই ফেলে গেছেন। চসিকের গাড়ি এসে এগুলো নিয়ে গেছে।
হালিশহরে ময়লা পরিষ্কার করার সময় কথা হয় চসিকের এক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর সঙ্গে। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাত থেকে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে চামড়া অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকেই বিপুল পরিমাণ চামড়া সড়ক থেকে সরাতে হয়েছে। বিশেষ করে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, আতুড়ার ডিপো, বিবিরহাট, হামজারবাগ এলাকায় বেশি চামড়া অপসারণ করতে হয়েছে। এখনো সেখানে চামড়া পড়ে আছে।
আতুড়ার ডিপো এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গতকাল থেকেই সেখানে চামড়ার স্তূপ ফেলে রাখা হয়েছে। সকালে আরো চামড়া নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী চামড়া বিক্রি করতে না পেরে আতুড়ার ডিপো থেকে শুরু করে বিবিরহাট ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় ফেলে চলে গেছেন। দীর্ঘ সময় চামড়া পড়ে থাকায় সব চামড়া পচে নষ্ট হয়ে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকায়। শুক্রবার সকাল থেকেই চসিকের ময়লার গাড়িতে এসব চামড়া নিয়ে গেলেও এখনো হাজার হাজার চামড়া রাস্তায় পড়ে আছে বলে জানান স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক মো. নাজমুল আলম বণিক বার্তাকে জানান, মুরাদপুর থেকে শুরু করে আতুড়ার ডিপো, বিবিরহাট, হামজারবাগ হয়ে প্রায় অক্সিজেন পর্যন্ত সড়কে বিপুল পরিমাণে চামড়া ফেলে রাখা হয়েছে। পচা গন্ধে সড়ক দিয়ে চলাচল করাই দায় হয়ে পড়েছে। রাস্তায় চামড়ার কারণে দুই লেনের এক লেন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দ্রুত চামড়া অপসারণ না করলে এলাকার মানুষই অসুস্থ হয়ে পড়বে।
আতুড়ার ডিপো এলাকার বাসিন্দা ফজলুল করিম মানিক বণিক বার্তাকে জানান, ঈদের দিন দুপুর থেকে এ চামড়ার মোকামে চামড়া আসতে শুরু করে। কিন্তু বেশির ভাগ চামড়াই বিক্রি না হওয়ায় শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই পড়ে ছিল। যেসব চামড়া বিক্রি হয়েছে, সেগুলো ১২০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে চামড়া বিক্রি না হওয়ায় পুরো এলাকায় চামড়ার পচা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। চসিকের গাড়ি এসে ছোট এক্সক্যাভেটর দিয়ে চামড়াগুলো ট্রাকে করে অপসারণের কাজ শুরু করলেও এখনো বিপুল পরিমাণ চামড়া সরানো সম্ভব হয়নি।
চামড়া বিক্রি করতে আসা সাইদুল নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘ঈদের দিন নয়টি চামড়া বিক্রি করতে পারলেও তার একটি চামড়া ফেলে দিতে হয়েছে। যে চামড়া বিক্রি হয়েছে, সেগুলো গড়ে ১৮০ টাকা দাম পেয়েছি। কিন্তু আমি প্রতি চামড়া গড়ে ৩০০ টাকা করে কিনেছি। গাড়ি ভাড়াও গেছে ১ হাজার ২০০ টাকা। সব চামড়া বিক্রি করতে পারলে কিছু টাকা পাওয়া যেত। লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে পারলে হয়তো কিছু চামড়া বিক্রি করা যেত। এবার যা ক্ষতি হয়েছে তাতে এ ব্যবসায় আর নামব না।’
আড়তদাররা জানান, সাধারণত ১২ থেকে ১৬ বর্গফুটের চামড়াকে ছোট আকার হিসেবে ধরা হয়। ১৭ থেকে ২২ বর্গফুট মাঝারি এবং ২৩ বর্গফুটের বেশি হলে সেটিকে বড় চামড়া হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নগরীর বাইরের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও এ আড়তে চামড়া এসেছে। এখানে চামড়া না এনে যদি সেখানে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা যেত, তাহলে এ সংকট দেখা যেত না। কারণ কোরবানির পর সর্বোচ্চ ৭-৮ ঘণ্টার মধ্যে চামড়া সংরক্ষণ করতে হয়। সঠিক সময় ও সঠিকভাবে চামড়া সংরক্ষণ করা না হলে চামড়ায় দাগ চলে আসে, তখন সেটা বিক্রি হয় না। কিন্তু চামড়া আতুড়ার ডিপোর আড়তে রাতে নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরা। আগে তিন শতাধিক ব্যবসায়ী ছিলেন, এখন মাত্র ২০-২৫ জন চামড়া কিনেছেন। এত চামড়া কিনে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করার মতো সক্ষমতা নেই।
চসিকের উপপ্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা প্রণব কুমার শর্মা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোরবানির পর থেকেই নগরীর সব জায়গা থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ চলছে। বিশেষ করে মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন মোড় পর্যন্ত সড়কে গরুর চামড়া ফেলে রাখা হয়েছে। আমরা সেগুলো অপসারণে কাজ করছি। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। আজ (গতকাল) রাত বা শনিবার সকালের মধ্য সব চামড়া বা বর্জ্য সরিয়ে ফেলা হবে।’
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়ার আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্যমতে, চট্টগ্রাম থেকে সব মিলিয়ে চার লাখ পিস চামড়া কেনার লক্ষ্যমাত্রা আছে ব্যবসায়ীদের। নগরীর পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন উপজেলা থেকে চামড়া সংগ্রহ করে সংরক্ষণের কাজ চলছে। সব চামড়া আড়তে আনতে কয়েকদিন সময় লাগবে।
সংগঠনটির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন জানান, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সরকারি দামে বিক্রির আশায় বেশি দামে চামড়া কিনেছেন। আমরা সেই দামে কিনতে পারিনি। চামড়া কিনে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে তারপর ট্যানারির লোকজন এসে সেই চামড়া কিনবে। ঢাকার ব্যবসায়ীরা সরকারি দামই দিতে চায় না। তাছাড়া লবণ, শ্রমিক ছাড়াও অন্যান্য খরচও এর সঙ্গে যুক্ত। তবে আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা আছে, সেটি পূরণ হবে। আতুড়ার ডিপোতে অনেক চামড়া এসেছে, সেগুলো ভালো না থাকায় ব্যবসায়ীরা হয়তো কেনেননি। চামড়া কেনার সময় অনেক কিছুই দেখে কিনতে হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে চামড়া নষ্ট হওয়ার মূল কারণ হলো ট্যানারি না থাকা। ঢাকার ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরশীল হতে গিয়ে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এ বাজারে টিকে থাকতে পারেননি। যদি চট্টগ্রামে কয়েকটি ট্যানারিও থাকত, তাহলে কোরবানির সময় এত চামড়া নষ্ট হতো না। চট্টগ্রামে ট্যানারি বাড়াতে হবে। নয়তো চামড়া খাতটি আমদানিনির্ভর হয়ে যাবে। তাছাড়া কেন চট্টগ্রামের ট্যানারিগুলো বন্ধ হয়ে গেল এবং কারা এ খাতটিকে চট্টগ্রামে টিকতে দিল না, সেই বিষয় নিয়ে তদন্ত করা দরকার বলেও মনে করেন তারা।


