বছরে ৩২৫ বিলিয়ন পাউন্ডের ‘ডার্টি মানি’ ঘুরছে যুক্তরাজ্যে
মে ২৬, ২০২৬
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১০ শিশুর মৃত্যু
মে ২৯, ২০২৬
বছরে ৩২৫ বিলিয়ন পাউন্ডের ‘ডার্টি মানি’ ঘুরছে যুক্তরাজ্যে
মে ২৬, ২০২৬
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ১০ শিশুর মৃত্যু
মে ২৯, ২০২৬

ঈদে ছুটিতে নিরাপত্তা শঙ্কা, অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন হচ্ছে

দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি খুন, ধর্ষণ, মব সহিংসতা ও অপহরণের মতো অপরাধের ঘটনা বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের ব্যবহৃত স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার নজিরও দেখা যাচ্ছে। আদালতের মতো স্পর্শকাতর জায়গা থেকে গুলি করে সাক্ষীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সব মিলিয়ে সারা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যে ঈদের সময়ের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির পশু বিক্রি, নগদ অর্থ বহন এবং ফাঁকা হয়ে যাওয়া রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েনের মাধ্যমে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার কথা জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে একটি সড়ক ঢুকে গেছে পাহাড়ের ভেতরে। সে পথেই শুরু জঙ্গল সলিমপুর। ছিন্নমূল ও আলীনগর—মূলত এ দুটি অংশে বিভক্ত এলাকাটি। সর্বশেষ রোববার দিবাগত গভীর রাতে জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে এসে গুলি চালায় র‍্যাব ক্যাম্পে। এরপর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাতে ঘটনাস্থলে অভিযান চালাতে না পারেন, সে লক্ষ্যে অন্তত তিনটি স্থানে রাস্তা কেটে দেয়া হয়। র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা র‍্যাবের ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। সন্ত্রাসীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকলে র‍্যাব সদস্যরাও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়েন। ঘটনাস্থলে যাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাড়তি ফোর্স যেতে না পারে সে লক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে দেয় সন্ত্রাসীরা। এর পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে পৌঁছে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করেছে।

জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাবের ওপর হামলার দিন সকালে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে দুজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। এর ঠিক একদিন আগে, গত শনিবার খুলনার দাকোপে একটি মাছের ঘের দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও উত্তেজনার জেরে র‍্যাবের গাড়ি ভাংচুর করে দুই আসামিকে ছিনিয়ে নেয় উত্তেজিত জনতা।

b5
এর আগে গত শুক্রবার নরসিংদীর চরাঞ্চলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন পুলিশ সদস্যরা। এ সময় সাদা পোশাকে থাকা ছয় পুলিশ সদস্যকে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে লাঞ্ছিত করা হয়। পরে কান ধরে উঠবস করে মাফ চাওয়ার পর তারা মুক্তি পান। হামলার শিকার পুলিশ সদস্যরা সবাই নরসিংদী সদর মডেল থানায় কর্মরত। এছাড়া এ ঘটনার পর পুলিশ, র‍্যাব ও ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ৮০ সদস্যের একটি দল অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

চলমান পরিস্থিতিতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রোঅ্যাক্টিভ বা পূর্ব-সতর্কতামূলক পুলিশিংয়ের ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশেই নানা ধরনের অপরাধ, বিশেষ করে মারামারি, মব তৈরি করে হামলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার চিত্র আমরা লক্ষ করছি। মূলত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ফিরে না আসার সুযোগ নিয়েই অপরাধীরা আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। এক শ্রেণীর অপরাধী আছে, যারা সবসময় অপরাধ করার জন্য বসে থাকে। পুলিশ, কোর্ট ও সংশোধনাগারগুলো যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে তাহলেই এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। পাশাপাশি যেকোনো অপরাধ দমনের জন্যই সেটার ওপর পর্যাপ্ত স্টাডি করা, ডেটা সংগ্রহ করা এবং ঝুঁকি পর্যালোচনা করে অভিযানে যেতে হবে। জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনাটা এর বড় উদাহরণ। সেখানে অপরাধীদের সঠিক কোনো ডেটাবেজ তৈরি করা যায়নি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সঠিক তথ্য না থাকায় তারা সেখানে কমসংখ্যক ফোর্স মোতায়েন রেখেছিল। ঠিক এ সুযোগ নিয়েই অপরাধীরা একযোগে হামলা চালায়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখন প্রোঅ্যাক্টিভ বা পূর্ব-সতর্কতামূলক পুলিশিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে হবে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় মার্চ ও এপ্রিলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় জানুয়ারিতে ৪২, ফেব্রুয়ারিতে ৪২, মার্চে ৬৩ ও এপ্রিলে ৬৬টি মামলা হয়। এর আগে ২০২৫ সালে পুলিশের ওপর হামলার ৬০১টি ঘটনা ঘটে।

পুলিশ খুব জোরালোভাবে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে আইন প্রয়োগ করতে পারছে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গায় দেখছি যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আক্রমণের শিকার হচ্ছেন এবং তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। আবার আদালতে গোলাগুলির মতো ঘটনাও ঘটছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই পারে, তবে এর সংখ্যা এবং ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়া উদ্বেগের। পুলিশে এখনো দৃঢ় মনোবল তৈরি হয়নি। এর ফলে চুরি, ছিনতাই, মব, মাদক, অন্যের সম্পদ দখলের মতো অপরাধগুলো বেড়ে যাচ্ছে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশকে কেউ বাধা দিলে তার বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এদিকে নাজুক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে ঈদের সময়ে নিরাপত্তা নিয়েও জনমনে একধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির পশু বিক্রি, নগদ অর্থ বহন এবং ফাঁকা হয়ে যাওয়া রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ঈদের ছুটিতে সারা দেশে নিয়মিত ফোর্সের বাইরে ৩৪ প্লাটুন এপিবিএন সদস্য অতিরিক্ত ফোর্স হিসেবে মোতায়েন করেছে পুলিশ সদর দফতর।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন নজরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঈদের সময়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দুটি দিকে বিশেষ মনোযোগ দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো রেলওয়ে, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনালে থাকা যাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে গন্তব্যে যেতে পারেন। আরেকটি হচ্ছে এসব যাত্রী যেন অপরাধীদের দ্বারা আক্রান্ত না হন সে বিষয়টি। পাশাপাশি ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হয়ে যাওয়া রাজধানীতে টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। সার্বিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *