
দাদা-দাদির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত শিশু রামিসা
মে ২১, ২০২৬
দেশের ছয় অঞ্চলে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের আভাস
মে ২২, ২০২৬রাজধানীর ভাটারা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান। পেশায় মাঝারি ব্যবসায়ী। তার একমাত্র ভাই থাকেন দেশের বাইরে।
তবে প্রতি বছরই ঈদে দেশে আসেন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে। পাঁচ বছর আগেও দুই ভাই মিলে একটি গরু ও একটি খাসি কোরবানি করতেন। তবে চার বছর ধরে তারা ভাগে গরু কোরবানি করছেন। শুধু এ দুই ভাই-ই নন, রাজধানীর অনেক মানুষই এখন এককভাবে গরু কোরবানির পরিবর্তে ভাগে কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন। খামারি ও পশু বিক্রেতারা বলছেন, ভাগে কোরবানির ক্রেতা বাড়ায় তুলনামূলক ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেড়েছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে এবার ভাগে কোরবানির প্রবণতা বেড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে পশুখাদ্যসহ উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় কোরবানির পশুর দামও বেড়েছে। বিপরীতে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ফলে বড় পশু কোরবানির প্রতিযোগিতার চেয়ে এখন অনেকেই ভাগে কোরবানির দিকে ঝুঁকছেন।
আব্দুর রহমান জানান, করোনাকালে তিনি ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানে পড়েন। এরপর থেকেই ভাগে গরু কোরবানি শুরু করেন। ধীরে ধীরে লোকসান কাটিয়ে উঠলেও আগের মতো আর একাই একটি গরু কোরবানি করেন না। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার দুই ভাই মিলে দুই ভাগ নিয়েছি। গরুর ভাগের দাম পড়েছে ৭৮ হাজার টাকা। এরপর কোরবানির দিন কসাইসহ আরো কিছু খরচ হবে। দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা অস্থিরতা রয়েছে। কভিড মানুষের অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। মানুষের ব্যয় বেড়েছে। সব মিলিয়ে সবাইকেই এখন খরচের বিষয়ে হিসাব করে চলতে হচ্ছে। শুধু কোরবানি নয়, গত চার বছরে আমার পরিবারের জীবনযাপনেও অনেক পরিবর্তন এসেছে।’
উত্তরার বাসিন্দা আরিফুল হক সাতজনের ভাগের একটি অংশ হিসেবে কোরবানি দিচ্ছেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে। মানুষের হাতে হয়তো আগের চেয়ে বেশি টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকার প্রকৃত মূল্য কত—সেটিও ভাবতে হয়। আমার আয় বেড়েছে, একই সঙ্গে ব্যয়ও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষকে হিসাব করে চলতে হচ্ছে। আগে গ্রামে গিয়ে ভাগে গরু ও খাসি কোরবানি করতাম। এখন শুধু গরুই কোরবানি করি।’
রাজধানীর ভাটারার ছোলমাইদ এলাকার নর্থ বেঙ্গল ডেইরি ফার্মের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইঞ্জিনিয়ার মকবুল হোসেন জানান, গত বছর ভাগে তার খামার থেকে ৫৭টি গরু বিক্রি হয়েছে। এবার গতকাল দুপুর পর্যন্ত ভাগের ৬০টি গরু বিক্রি হয়েছে। আরো কয়েকটি গরুর ভাগ নেয়ার অর্ডার পেয়েছেন। তার হিসাবে গতবারের তুলনায় তার খামারে এবার ভাগে কোরবানির জন্য গরু বিক্রি ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া তিনি জানান, বড় গরুর তুলনায় দেড় লাখ টাকার আশপাশের গরুর চাহিদা অধিক।
তিনি বলেন, ‘আগে ধনাঢ্য মানুষরা প্রতিযোগিতা করে বড় বড় গরু কিনতেন। বিগত কয়েক বছর ধরে এ প্রতিযোগিতা কমেছে। মানুষ এখন ছোট গরুতেই ঝুঁকছে। কারণ পালনের ব্যয় বাড়ায় পশুর দামও বেড়েছে। আবার মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় অনেকের জীবনযাত্রার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে অনেকেই ব্যয় সংকোচনের পথ খুঁজছে। সেজন্য মানুষ এখন কিছুটা হিসাব করেই খরচ করেন। তবে বড় গরুর চাহিদা একেবারেই নেই, তা কিন্তু নয়। তুলনা করলে গত তিন বছরে এটা কমেছে।’
খাসির ক্ষেত্রেও বড়র তুলনায় মাঝারিগুলোর চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন মকবুল হোসেন। বেশ কয়েকজন খামারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা দামের খাসির চাহিদা তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত এপ্রিলে দেশে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। যেটি ২০১০-১১ অর্থবছরের পর সর্বোচ্চ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং তার আগের অর্থবছরে এ হার ছিল ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।
দেশের প্রক্রিয়াজাত ও হালাল মাংসের অন্যতম বড় উৎপাদক বেঙ্গল মিট। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব মার্কেটিং শেখ ইমরান আজিজ বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, তাদের কাছে ২০০ থেকে ২৫০ কেজি ওজনের গরুর চাহিদা সর্বাধিক। এসব গরুর দাম ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার মধ্যে। গত বছরের তুলনায় এ আকারের গরু বিক্রির প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের মতো। বেঙ্গল মিটের ভাগের কোরবানি প্যাকেজের মধ্যে ২৭ থেকে ৪০ হাজার টাকার গরু রয়েছে। ২৭ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মধ্যে যেসব ভাগ আছে সেগুলোর চাহিদা অধিক। তিনি জানান, গতবারের তুলনায় এবার তাদের ভাগে কোরবানির (বিক্রি) প্রবৃদ্ধি ১৫০ শতাংশের মতো।
শুধু আর্থিক সমস্যার কারণেই মানুষ ভাগে কোরবানি দিচ্ছে এমন না বলে মনে করেন শেখ ইমরান আজিজ। তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকটি কারণে ভাগে কোরবানি বেড়েছে। একক কোরবানির চেয়ে ভাগে হ্যাসেল কম। ভাগে নিলে কেটে বাসায় পৌঁছেও দেয়া হয়। এমন নানা সুবিধার কারণেও এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক সমস্যা যে নেই, তা বলব না। তবে অনেক বিত্তবানও এখন ভাগে কোরবানি করছেন সুবিধার কারণে।’
রাজধানীর মাশা’আল্লাহ ক্যাটেল ফার্মের স্বত্বাধিকারী জাহিদুল ইসলাম তামিমের মতেও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি। তিনি বলেন, ‘মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি করে। দেশে বিত্তবান মানুষের তুলনায় মধ্যবিত্ত বেশি। সেজন্য মাঝারি বা ছোট আকারের গরুর বিক্রি বেশি।’
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওজন অনুযায়ী গরুর দাম নির্ধারিত হয়। এরপর প্রতিটি গরুর সাতজন ক্রেতা হিসাব করে ভাগের গরুর দাম রাখা হয়। ক্রেতারা দাম পরিশোধের মাধ্যমে ভাগ ক্রয় করেন। এরপর ঈদের দিন খামার বা প্রতিষ্ঠান গরু কেটে ক্রেতাদের ভাগ বুঝিয়ে দেন। আবার চাইলে সেই মাংস বাসায়ও পৌঁছে দেয়া হয়। ভাগের দামের ১০ থেকে ১৮ শতাংশ চার্জ ধরা হয় কসাই, বাসায় পৌঁছে দেয়াসহ অন্যান্য খরচ বাবদ। যদিও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এ বাবদ ভাগপ্রতি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চার্জ নিয়ে থাকে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু। ফলে চাহিদার তুলনায় এবার বাজারে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ রয়েছে। ছাগল ও ভেড়া আছে ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং ৫ হাজার ৬৫৫টি অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর মানুষ মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট। এতে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরা। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে পশুপালনকারীর ব্যয় বেড়েছে। সেটি দামেও প্রভাব ফেলছে। এখন সেটি কোরবানিতেও প্রভাব তৈরি করছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লম্বা সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনীতির মন্দা ভাব মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় প্রভাব ফেলেছে। যার কারণে মানুষকে কোরবানির পশু কিনতে গিয়েও ভাবতে হচ্ছে। গত কয়েক মাসে যে হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে সেভাবে মজুরি বাড়েনি, এটি একটি কারণ। আরেকটি কারণ হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘ হবে কিনা সে চিন্তাও ভোক্তাদের মধ্যে আছে। সে জন্য তাদের জমানো অর্থ ব্যয়ে হিসাব-নিকাশ করছে। এটি এখন মানসিক একটি বিষয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে বলতে পারি। এখানে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে মধ্যবিত্তদের। সব মিলিয়ে এটির একটি প্রভাব ঈদ বাজারে পড়েছে।’


