
সংবিধান সংশোধনে বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব, জামায়াত-এনসিপির যাওয়া অনিশ্চিত
মে ১৮, ২০২৬
শাহজালালে ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু একসঙ্গে সেবা পাবে ৩৭ হাজার যাত্রী
মে ১৮, ২০২৬রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (শিশু হাসপাতাল) বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে ছয় মাস বয়সী শিশু নাজনীনকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন তার মা মনোয়ারা বেগম।
অক্সিজেনের মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশু নাজনীনকে। সেখানে কথা হয় মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে। নিজের মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা জানাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। বণিক বার্তাকে জানান, তার বাড়ি ভোলায়। মেয়ের হালকা জ্বর ছিল, পরে ঠাণ্ডা ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। তবে অবস্থার অবনতি হলে সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আসার পরামর্শ দেন সেখানকার চিকিৎসকরা। সুদূর ভোলা থেকে এলেও শিশু হাসপাতালে শয্যা পাবেন কিনা তা নিয়ে আছেন অনিশ্চয়তায়।
দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এ চাপ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক স্থানে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করলেও রোগীর তুলনায় তা অপ্রতুল। ফলে হাসপাতালের ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ এমনকি বারান্দাতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে। অনেক অভিভাবক ঘণ্টার পর ঘণ্টা সন্তানকে কোলে নিয়ে অপেক্ষা করেও শয্যা পাচ্ছেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অনেক রোগীকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
দেশের শিশুদের জন্য একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল এ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটির হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের জন্য শয্যা ১৫টি থেকে বাড়িয়ে বর্তমানে ৬০-৭০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। আগে যেটি ডায়রিয়া ওয়ার্ড ছিল, সেটিকেও এখন হাম ওয়ার্ড করা হয়েছে। শয্যা সংখ্যা চার-পাঁচ গুণ বাড়ানোর পরও অনেক রোগীকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমানে হাসপাতালে আসা অধিকাংশ শিশুই জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ জটিল উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় দ্রুত চিকিৎসা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হচ্ছে। এতে হাসপাতালগুলোর বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে নতুন বেড যুক্ত করার পরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। শয্যা খালি না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেক রোগীকে অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
হাসপাতালটির ২ নম্বর ওয়ার্ডে কর্মরত আবাসিক চিকিৎসক ডা. রাকিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। শয্যার অভাবে প্রতিদিন অনেক রোগীকেই ফেরত পাঠানো হয়।’
hum
হাসপাতালটিতে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৮৩ জন। এ পর্যন্ত মোট ভর্তি হয়েছে ৬৬৯ জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে ২৯ জন।
হাসপাতালটির পেডিয়াট্রিক ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড কমিউনিটি পেডিয়াট্রিকস বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো আতিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ জটিল রোগীই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঢাকায় হামের রোগী নেই। ঢাকার অনেক রোগী স্থানীয়ভাবে বা প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যেসব শিশুর মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা তৈরি হচ্ছে, তাদের দ্রুত ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে উন্নত চিকিৎসার জন্য।’
তিনি বলেন, ‘জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে অনেক চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চান না। রোগীর অবস্থা খারাপ মনে হলেই তারা ঢাকায় রেফার করছেন। ফলে সারা দেশের চাপ এসে পড়ছে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর। এ চাপ কমাতে জেলা পর্যায়ের মেডিকেল কলেজ ও বড় হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ও উন্নত শিশু চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো জরুরি। প্রতিটি জেলায় যদি অন্তত ১০ থেকে ১৫টি আইসিইউ শয্যা থাকত, তাহলে ঢাকার ওপর চাপ অনেকটাই কমে যেত।’
সারা দেশে শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে একজনের এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। একই সময়ে হাম শনাক্ত হয়েছে ২৪৩ শিশুর। আর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৬৪ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে মোট ৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৮৪ জন শিশুর। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা গেছে মোট ৫৭ হাজার ৮৪৬ শিশুর মধ্যে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪২ হাজার ৯২ শিশু। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৭৬৭ শিশুর হাম শনাক্ত হয়। আর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া রোগীর সংখ্যা ৩৭ হাজার ৭৪৪।
জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আবু জামিল ফয়সাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা করাতে কোনো সমস্যা নেই। যখন কোনো শিশুর পরিস্থিতি খারাপ দেখা দেয় তখন সেখানকার চিকিৎসকরা ঢাকায় রেফার করে দেন। এর মূল কারণ হলো সেখানকার চিকিৎসকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব। টিকা দেয়ার পাশাপাশি নার্সদের আরো দক্ষ করে তোলা দরকার, যেন কর্মরত চিকিৎসকদেরও মনোবল বৃদ্ধি পায়। এতে করে ঢাকায় রেফার করা রোগীর সংখ্যা অনেকাংশে কমে আসবে।’


