সৌদি পৌঁছেছেন ৪০ হাজার ১৭৭ জন হজযাত্রী
মে ২, ২০২৬
পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ দেশের মোট স্থায়ী মূলধনের মাত্র ৬ শতাংশ
মে ৩, ২০২৬
সৌদি পৌঁছেছেন ৪০ হাজার ১৭৭ জন হজযাত্রী
মে ২, ২০২৬
পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়নের পরিমাণ দেশের মোট স্থায়ী মূলধনের মাত্র ৬ শতাংশ
মে ৩, ২০২৬

ঘনবসতির ঢাকায় কবরস্থানের সংকট, বেশির ভাগের সাধ্যের বাইরে কবর সংরক্ষণ ফি

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা দিনমজুর আরমান হোসেন। সম্প্রতি বাবা হারিয়েছেন তিনি। নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো আরমানের গ্রামে ফেরারও উপায় নেই।

তাই বাবাকে দাফন করেন জুরাইন কবরস্থানে। দাফন করতে সরকারি খরচ গুনতে হয় প্রায় ২ হাজার টাকা। এছাড়া দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্য প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে আরো ৩ হাজার টাকা খরচ হয় তার। আরমানের কথায়, গ্রামে মানুষ মারা গেলে কবর দেয়ার জন্য কোনো টাকা লাগে না। কিন্তু ঢাকায় কবর দিতেও হাজার হাজার টাকা খরচ হয়।

ঢাকায় কবর সংরক্ষণের জন্য বেশ মোটা অংকের ফি গুনতে হয়। জানা যায়, ঢাকায় সাধারণ কবর দেয়ার জন্য ২ থেকে ৫ হাজার টাকা লাগলেও সেটা সংরক্ষণের খরচ অনেক বেশি। ঢাকায় কবর সংরক্ষণের সর্বোচ্চ মেয়াদ ২৫ বছর এবং সেজন্য খরচ দেড় কোটি টাকা। সে হিসাবে মাসিক খরচ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া ৫, ৮, ১০ ও ১৫ বছর বা বিভিন্ন মেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য উচ্চ হারে ফি গুনতে হয়।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, জমির তীব্র সংকটের কারণেই ঢাকায় বাড়ছে কবর সংরক্ষণের খরচ। ঢাকার আরো অনেক সেবার মতো কবরস্থান নিয়েও প্রয়োজনীয় পরিকল্পনার অভাব নগরবাসীর জন্য পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে। শোক আর আবেগের মুহূর্ত ও প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাকে সংরক্ষণ করতে গিয়ে সাধ্যে কুলাচ্ছে না বেশির ভাগ নগরবাসীর।

ঢাকা-২ সিটি করপোরেশনের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই সিটির মোট আয়তন ৩০৫ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আয়তন ১৯৬ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার। এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আয়তন ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার। ৩০৫ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে দুই সিটির কবরস্থান রয়েছে ২৫১ একর, যা মোট আয়তনের দশমিক ৩৩ শতাংশ। এর মধ্যে ডিএনসিসির কবরস্থানের আয়তন ১৯২ একর এবং ডিএসসিসির ৫৯ একর। দুই করপোরেশনেই এক-তৃতীয়াংশ কবরস্থান সংরক্ষিত আর বাকিগুলো সাধারণ কবর হিসেবে বিবেচিত। সংরক্ষিত কবরের জায়গা বাদ দিলে কবরস্থানে জনসাধারণের জন্য জায়গা আরো কমে যায়।

ঢাকায় কবরস্থানের সংকট বেশি তীব্র দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। এ সিটি করপোরেশনের তিনটি কবরস্থানের মধ্যে আছে—আজিমপুর কবরস্থান, খিলগাঁও ও জুরাইন কবরস্থান। ডিএসসিসির আজিমপুর কবরস্থান ৩৭ দশমিক ৫০ একর আয়তনের। এখানে ২৫ হাজার কবরের জায়গা আছে। সংরক্ষিত কবর ২ হাজার ৬০০টি। খিলগাঁও কবরস্থান পাঁচ একর জমিতে অবস্থিত। প্রায় ৪ হাজার কবরের জায়গা রয়েছে এখানে; তবে কবর সংরক্ষণের সুযোগ নেই। ১৭ দশমিক ২৬ একর জায়গায় জুরাইন কবরস্থান। এখানে ১২ হাজার কবরের জায়গা রয়েছে। সংরক্ষিত কবর ২ হাজার ৭০০টি। এছাড়া মুরাদপুরে ৪২ শতাংশ জমিতে শিশুদের জন্য একটা কবরস্থান রয়েছে।

২০১৮ সালে ডিএসসিসি ও ডিএনসিসিতে ১৮টি করে মোট ৩৬টি নতুন ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু সেই ৩৬টি ওয়ার্ডে এখন পর্যন্ত কোনো কবরস্থান নির্মাণ করা হয়নি। ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের কবরস্থানের সংকট রয়েছে। কবরস্থানের জন্য আরো জায়গা দরকার। বিশেষ করে মানুষ মারা যায় এক জায়গায়, তাকে কবরস্থ করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে নিয়ে আসতে হয়। আমরা এরই মধ্যে নতুন ওয়ার্ডগুলোতে একটি বড় কবরস্থানের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বলেছি, একশ একরের মধ্যে নতুন কবরস্থানটি হতে হবে। তাহলে চাপ কিছুটা কমানো যাবে।’

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, উন্নত শহরে কবরস্থানের জায়গা নির্ধারণের জন্য পরিকল্পনার বিভিন্ন সূত্র রয়েছে। সাধারণত পশ্চিমা দেশগুলোতে শহরে কবরস্থানের জন্য দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত জমি ব্যবহার করা হয়। কখনো কখনো এটা আরো বেশি হতেও দেখা যায়। কোথাও সবুজ কবরস্থান বা বহুতল সমাধিও নির্মাণ হচ্ছে। ঢাকার মতো ঘনবসতির শহরে কবরস্থানের জন্য জায়গা বের করা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করেন পরিকল্পনাবিদরা।

ঢাকায় কত আয়তনের, কতটি কবরস্থান প্রয়োজন সেটা এখনো পরিকল্পিতভাবে নির্ণয় করা হয়নি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম মনে করেন, ঢাকায় এখনো কবরস্থানের সংকট ততটা তীব্র হয়ে ওঠেনি।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় কী পরিমাণ কবরস্থান প্রয়োজন সে আলোচনাটা এখনো জোরালো হয়নি। না হওয়ার কারণ হলো নগরের বেশির ভাগ বাসিন্দা তাদের নিজ গ্রামে স্বজনকে কবর দিতে চায়। যদিও নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঢাকায় কবরস্থ হওয়ার বিষয়টা আলোচনায় আসবে। আবার ভিটেমাটি হারিয়ে ঢাকায় স্থায়ীভাবে চলে আসা মানুষের সংখ্যাটাও দিন দিন বাড়ছে। আগামী ২০ বছরের মধ্যে ঢাকায় কবর দেয়ার প্রবণতা আরো বাড়বে। তাই এখনই ঢাকায় কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন।’

বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট কবরস্থান নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে জানিয়ে রাজউকের এ নগর পরিকল্পনাবিদ আরো বলেন, ‘বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ৫০ হাজার মানুষের বিপরীতে একটি এক একরের কবরস্থান প্রয়োজন। জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিসংখ্যান তো বলছে, ঢাকায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বাস। বেসরকারি অন্যান্য হিসাবে এটা ২ কোটি। সে হিসাবে ঢাকায় ৪০০-৫০০ একরের কবরস্থান প্রয়োজন, অর্থাৎ বিদ্যমান কবরস্থানের দ্বিগুণ আয়তনের।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় কবরস্থান রয়েছে ছয়টি। এর মধ্যে বনানী, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, রায়েরবাজার, উত্তরা ৪ নম্বর, উত্তরা ১২ নম্বর ও উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থান। এসব কবরস্থানে দাফন করতে হলে ৫০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয়।

জনসংখ্যার বিবেচনায় ঢাকায় কবরস্থানের সংকট রয়েছে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তাছাড়া ঢাকায় কবরস্থানগুলোর অবস্থানও পরিকল্পিত না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। তার মতে, কবরস্থান সেবার ফি এবং উচ্চ সংরক্ষণ ফি-ই প্রমাণ করে ঢাকায় কবরস্থানের তীব্র সংকট রয়েছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌কবরস্থান একটা আবেগের জায়গা। প্রিয়জনের শেষ চিহ্ন। অন্তত এক-দুই পুরুষ পর্যন্ত কবরস্থান সংরক্ষণ করাটা মানুষের স্বাভাবিক আবেগ।’

কবর সংরক্ষণের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‌ঢাকায় ২৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে দেড় কোটি টাকা গুনতে হয়। এ হিসাব থেকেই বোঝা যায়, কবরস্থান সংকট ঢাকায় কত তীব্র! এত উচ্চ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে কেন? মানুষ যেন কবর সংরক্ষণ করতে নিরুৎসাহিত হয়। তার মানে তো সংকট রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কবরস্থানকে কমিউনিটি স্পেস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইরানে, উজবেকিস্তানে এ রকম চর্চা আছে।’

সংকট মোকাবেলায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট কবরস্থানের সুপারিশ করা হয়েছে ড্যাপে। এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কবরস্থান নিয়ে একটা গবেষণায় আমি দেখিয়েছি, প্রতি ২০ হাজার মানুষের জন্য একটা কবরস্থান প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের প্রতি ওয়ার্ডে তো এক-দুই লাখ মানুষও বসবাস করে। কিন্তু সিটি করপোরেশন ১০০ একরের বড় আকারের কবরস্থান করতে চায়। কারো প্রিয়জন মারা গেলে, দেখা গেল ২০ কিলোমিটার দূরে বড় কবরস্থান। আবার কয়েক মাস পরে গিয়ে দেখা যায় সেখানে নতুন কাউকে কবর দেয়া হয়েছে। ঢাকার কবরস্থান ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে স্পষ্ট হয়, আমরা এখনো মানুষের মানবিক আবেগকে যথাযথ মূল্য দিতে শিখিনি। ফলে কবরস্থানের জায়গাও অনেক টাকায় কিনতে হচ্ছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *