
ডলারের চাঙ্গা ভাব ও শান্তি আলোচনার আভাস বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দরপতন
এপ্রিল ১৬, ২০২৬
জ্বালানি তেল রফতানিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রেকর্ড ছোঁয়া অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র
এপ্রিল ১৬, ২০২৬মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা ও নতুন করে সংলাপ শুরুর প্রচেষ্টায় তেহরানে পৌঁছেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
তার নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল এরই মধ্যে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা নিয়ে এ সফরে গেছেন আসিম মুনির, যার লক্ষ্য দুই পক্ষকে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনা। প্রতিনিধি দলে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভিও রয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সফরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি বার্তা তেহরানের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। সে বার্তা নিয়ে আলোচনা শেষে পরবর্তী ধাপে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে সংলাপের সময়সূচি নির্ধারণ করা হতে পারে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, ইসলামাবাদকেই আবার আলোচনার সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনায় বসানোর চেষ্টায় মধ্যপ্রাচ্য সফরে গেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সফরের শুরুতে গতকাল সৌদি আরব যান তিনি। এছাড়া কাতার ও তুরস্ক সফরেও যাওয়ার কথা রয়েছে তার।
এ কূটনৈতিক তৎপরতার পটভূমিতে পরিস্থিতি কিন্তু ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরে সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ড সংস্থা খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের প্রধান মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি গতকাল এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
আবদুল্লাহি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এ অবরোধ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে।’ তার বরাত দিয়ে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, এ পরিস্থিতিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরে কোনো দেশের আমদানি বা রফতানি জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে না। উল্লেখযোগ্য, ইরান লোহিত সাগরে সরাসরি সীমান্তবর্তী না হলেও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর মাধ্যমে সেখানে শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে থাকে, যারা এর আগেও ওই অঞ্চলে জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
এ উত্তেজনার মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আশাবাদী সুর বজায় রেখেছেন। এবিসি নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে গতকাল তিনি বলেন, ‘সামনের দুই দিনে অসাধারণ কিছু দেখতে পাবেন।’ ফক্স বিজনেস নেটওয়ার্কে প্রচারিত অন্য একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এ যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হবে এবং যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না।’ পাকিস্তানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরও ট্রাম্প জানান, তার আলোচক দল সম্ভবত আবার পাকিস্তানে ফিরবে।
এদিকে গতকাল বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে এবং আলোচনা পুনরায় শুরু করতে গতকাল সমঝোতার আরো কাছাকাছি পৌঁছেছেন মধ্যস্থতাকারীরা। নৌ-অবরোধ ও নতুন করে হুমকির ফলে অস্থিরতা তৈরি হলেও দুই দেশ যুদ্ধবিরতি বাড়াতে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে বলেও জানিয়েছে এপি।
তবে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে কোনো ‘নীতিগত সমঝোতা’ হওয়ার খবর অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, এ ধরনের খবরের কোনো ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে যেসব গুঞ্জন ও ধারণা ছড়ানো হচ্ছে, তার একটিও এ মুহূর্তে নিশ্চিত নয়। বর্তমানে পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনা চলছে। আমাদের দেখতে হবে প্রতিপক্ষ কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে বাস্তবে কতটা আন্তরিক। যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে।’ অন্যদিকে, বার্তা সংস্থা রয়টার্স একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়ে কোনো সম্মতি দেয়নি। তবে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত সপ্তাহান্তের আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের প্রধান বিষয় ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে, যা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘদিনের দাবি থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত। অন্যদিকে ইরান তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য কার্যক্রম বন্ধ রাখার পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রধান রাফায়েল গ্রোসি সিউলে বলেছেন, যেকোনো মেয়াদের বিরতির বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ইরান আস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ হিসেবে একটি আপসমূলক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে চিঠি লেখার পর চীন ইরানকে অস্ত্র না পাঠানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, চীন হরমুজ প্রণালি স্থায়ীভাবে উন্মুক্ত রাখার তার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে এবং দুই দেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করছে। তবে এ চিঠিগুলো ঠিক কবে আদান-প্রদান করা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি ট্রাম্প। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কোনো দেশ যদি ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করে তবে সেই দেশের পণ্যের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করা হবে। এর আগে মঙ্গলবার চীন মার্কিন অবরোধকে দায়িত্বহীন আখ্যা দিয়ে বলেছিল, এটি যুদ্ধবিরতিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণের বিষয়ে আসা কোনো চাপের কাছে ‘নতি স্বীকার’ করবেন না বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। গতকাল পার্লামেন্টে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। আগের দিন রাতে এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, গত বছর সম্পাদিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলি যেকোনো সময় পরিবর্তন করা যেতে পারে। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর স্টারমার এ প্রতিক্রিয়া জানালেন। পার্লামেন্টে স্টারমার বলেন, ‘এটি আমাদের যুদ্ধ নয়। আমাকে ভিন্ন অবস্থান নেয়ার জন্য অনেক চাপ দেয়া হয়েছে এবং গত রাতের ঘটনাও সেই চাপের অংশ ছিল।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করব না। আমি নতি স্বীকার করব না। এ যুদ্ধে যোগদান আমাদের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয় এবং আমরা তা করব না। আমি জানি আমার অবস্থান কোথায়।’
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকলেও লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার মুখে দক্ষিণ লেবাননের বাড়িঘর ছেড়ে হাজার হাজার শিশু পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ইসরায়েলি হামলায় দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১২ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে সাড়ে তিন লাখের বেশি শিশু। এদিকে লেবাননে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ ১০টি দেশ। এক যৌথ বিবৃতিতে দেশগুলো লেবাননে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জর্ডান, সিয়েরা লিওন, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতিটি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, লেবাননের ক্রমাবনতিশীল মানবিক পরিস্থিতি ও বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল বা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।


