পুঁজিবাজা‌রে সূচক কমেছে প্রায় ১ শতাংশ দেশের পুঁজিবাজারে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গতকাল সূচকে নিম্নমুখিতা দেখা গেছে।
মার্চ ৩০, ২০২৬
বজ্রপাতে মৃত্যু
মার্চ ৩০, ২০২৬
পুঁজিবাজা‌রে সূচক কমেছে প্রায় ১ শতাংশ দেশের পুঁজিবাজারে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে গতকাল সূচকে নিম্নমুখিতা দেখা গেছে।
মার্চ ৩০, ২০২৬
বজ্রপাতে মৃত্যু
মার্চ ৩০, ২০২৬

সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিরোধী দলের নোটিস ঘিরে সংসদে বিতর্ক

জুলাই জাতীয় সনদ অনুসারে সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার ও এ-সংক্রান্ত আলোচনা করতে বিরোধী দলের নোটিস ঘিরে বিতর্কে জড়িয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল।

গতকাল সংসদের মুলতবি অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত ওই নোটিস নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও বিরোধীদলীয় নেতা বিতর্কে জড়ান। পরে প্রস্তাবটি রুলিং দিয়ে প্রস্তাবের ওপর আগামীকাল নোটিসের ওপর ২ ঘণ্টার আলোচনার সময় নির্ধারণ করেন ডেপুটি স্পিকার।

গতকাল ঈদের ছুটির পর বেলা সাড়ে ৩টায় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি অধিবেশন শুরু হয়। এদিন প্রথমবারের মতো সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। প্রথমে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। প্রশ্নোত্তর শেষে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি-৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে স্পিকার সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন। এ সময় পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জুলাই জাতীয় সনদ, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ উত্থাপন করেন এবং এটি নিয়ে আলোচনার দাবি জানান। কিন্তু সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী আগে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি অনুসারে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের পর এ নোটিসের ওপর আলোচনা হতে পারে। এ বিষয়ে সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি জানান, প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি শেষে নোটিসের বিষয়ে আলোচনা করা হতে পারে।

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল জানান, দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিসের ওপর আলোচনা শেষে বিরোধী দলের আনা নোটিসের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে।

পরে নামাজের বিরতিতে যান সংসদ সদস্যরা। বিরতি শেষে বিরোধীদলীয় নেতা নোটিসটি উত্থাপন করেন। তিনি জানান, ১৫ মার্চ তিনি পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে একটি অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছিলেন। স্পিকার পরামর্শ দিয়েছিলেন নোটিস আনার জন্য। তারা সেটা করেছেন। তিনি এই নোটিস সংসদে উত্থাপন করলেন। তিনি নোটিসটি গ্রহণ করে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিষয়ে আলোচনার দাবি জানান। ফ্লোর নিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও বিধি-৭১-এর নোটিসের আলোচনা শেষে অন্য বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।’ জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘প্রশ্নোত্তরের পরেই এ আলোচনা হবে। তিনি সে মোতাবেকই দাঁড়িয়েছেন।’

এরপর ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কথা বলার সুযোগ দেন স্পিকার। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। সরকারি দল বিধি মোতাবেক আলোচনার সুযোগ দেয়ার পক্ষে। রীতি অনুযায়ী প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধির পর মুলতবি প্রস্তাব আলোচনা হতে পারে। তখন সরকারি দলও পয়েন্ট অব অর্ডারে কিছু কথা বলবে।’ তিনি স্পিকারকে বিধি মোতাবেক এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংসদের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে কীভাবে এ সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সবাই ভুলে যাচ্ছে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটও হয়েছিল। কিন্তু এখন কার্যক্রম দেখলে মনে হয় এ ধরনের কিছুই হয়নি। এটি সবচেয়ে বেশি জনগুরুত্বপূর্ণ, এ সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত, এর সুরাহা হওয়া উচিত। তারপর নিয়মিত সব কার্যক্রম হওয়া উচিত। বিরোধীদলীয় নেতা বিধি মোতাবেকই নোটিস দিয়েছেন।’ সেটা নিয়ে আগে আলোচনা করার অনুরোধ করেন তিনি।

তবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বলেন, ‘স্পিকার চাইলে অনুমতি দিতে পারেন। কিন্তু প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এগুলো সংসদ সদস্যদের অধিকার। এ দুটি কার্যসূচির জন্য ২ ঘণ্টা বরাদ্দ।’

ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘তিনি বিরোধী দলের নোটিসটি পেয়েছেন। তিনি এটা অ্যাড্রেস করবেন। সংসদের রীতি মেনে বিধি-৭১-এর নোটিসগুলো নিয়ে আলোচনা শেষে তিনি বিরোধী দলের আনা নোটিসটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।’

বিতর্কের মাঝেই দ্বিতীয় পর্ব শেষে আবারো মাগরিবের নামাজের বিরতিতে যায় সংসদ। তৃতীয় পর্বে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান পুনরায় নোটিসের বাকি অংশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট বিজয়ী হওয়ায় সংসদ সদস্যরা সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে আইনগতভাবে বাধ্য। সংসদের প্রথম অধিবেশনের পর ৩০ পঞ্জিকার দিবসের মধ্যে একই পদ্ধতিতে সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা থাকলে তা করা হয় নাই। জাতির প্রত্যাশা পাশ কাটিয়ে এমন অচলাবস্থা তৈরি করা কাম্য নয়। এ অবস্থায় জনগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ বাস্তবায়নে অধিবেশন মুলতবি করে আলোচনার জন্য দেয়া হোক।’

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দুই পক্ষের আলোচনার জন্য সময় প্রয়োজন জানিয়ে বলেন, ‘অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। আমরাও এ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই। বাংলাদেশ সংবিধান, জুলাই সনদ, সংস্কার পরিষদ আদেশসহ ছয়টি বই প্রত্যেক সদস্যের টেবিলে থাকতে হবে।’ স্পিকারকে আলোচনার জন্য তারিখ ঘোষণা করতে আহ্বান জানান তিনি।

পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন বিরোধীদলীয় নেতার আনা প্রস্তাবের সমালোচনা করে বলেন, ‘বিরোধী দলের আনা মুলতবি প্রস্তাবটি বিধি অনুযায়ী সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। এটি পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন রয়েছে। আপনি বৈধভাবে আগে নোটিস দিতে বলেন, তারপরে আলোচনা হবে।’ এ সময় তিনি সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ৬২, ৬৮ ও ৬৩ ধারা উল্লেখ করে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা এবং মুলতবি প্রস্তাবের জন্য সঠিক বিধি অনুযায়ী নোটিস করা উচিত বলে মত দেন।

তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয় মূলত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য, যা বিধি ৬৩ অনুযায়ী মুলতবি প্রস্তাবের আওতায় আনা যায় না।’ তিনি এ ধরনের বিষয়ে সংসদে সরাসরি বিতর্কের পরিবর্তে একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠন করে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘সরকার ও বিরোধী দলসহ সকল পক্ষকে নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে একটি সমন্বিত প্রস্তাব আনা যেতে পারে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য চলাকালে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বারবার দাঁড়িয়ে, চিৎকার করে ও টেবিল চাপড়ে প্রতিবাদ করেন। এ সময় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নোটিসের সংশোধনী ছিল বলে মন্তব্য করেন। পরে বিরোধীদলীয় নেতা আবারো কথা বলতে চাইলে সরকার দলীয় কয়েকজন সদস্য প্রতিবাদ জানান।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবারো কথা বলতে চাইলে ডেপুটি স্পিকার কথা শুনতে চাননি। তিনি রুলিং দিয়ে বলেন, ‘সবার বক্তব্য শ্রবণ করে সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি ৬৫-এর ২ অনুযায়ী আমাদের তিনদিনের মধ্যে এ বিষয়টাকে নিষ্পত্তি করতে হবে। সেই হিসাবে ৩১ মার্চ দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসাবে ২ ঘণ্টা বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গণভোটের যে জনরায় ছিল সেটিকে বারবার অমান্য করা হচ্ছে, অসাংবিধানিক বলা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্যে সংস্কার কমিটি করার প্রস্তাব এনেছেন, তিনি এটা আনতে পারেন না। গণভোটের জন্য আজকে আমরা এখানে আসতে পেরেছি। এখানে সংবিধান পরিবর্তন নয়, সংবিধান সংস্কার করতে এসেছি।’

গণভোটের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী প্রচার করেছেন উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, ‘আজকে কেন এটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে হবে? আমরা নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের কথা ভুলে যাইনি। কিন্তু এরপর ১৯৯৪ সালে মাগুরার উপনির্বাচন (বিতর্কিত) কারা আয়োজন করেছিল? আজকে আবার সে ব্যবস্থায় নিয়ে যাচ্ছেন। আরেকবার যে মাগুরার মতো উপনির্বাচন আয়োজন হবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে।’

বিতর্ক শেষে স্পিকার অন্যান্য সদস্যদের বক্তব্য শুনে আজ বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *