
হরমুজ সংকট ‘যাদের রক্ষা করেছি তারাই পাশে নেই’, মিত্রদের ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
মার্চ ১৭, ২০২৬
সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন পাঁচ ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে বিএসইসির জরিমানা
মার্চ ১৭, ২০২৬ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে; আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এ প্রেক্ষাপটে হরমুজে জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে মিত্র দেশগুলোকে নিয়ে একটি নৌ-জোট গঠনের কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার যুক্তি, উপসাগরীয় তেলনির্ভর দেশগুলোরও এ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসা উচিত; পুরো দায় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপানো ঠিক নয়। ট্রাম্প যে দেশগুলোকে এ জোটে দেখতে চান, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া; পাশাপাশি ন্যাটোকেও এতে সম্পৃক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। মিত্র দেশগুলোর পাশাপাশি চীনের দ্বারস্থও হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এমনকি সহায়তায় অনীহা দেখালে মিত্রদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার হুমকিও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ‘খুব খারাপ’ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের এ আহ্বানে বড় মিত্রদের স্পষ্ট সাড়া মেলেনি।
জার্মানি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ট্রাম্পের ডাকে ‘না’, যুদ্ধে জড়াবে না তারা। ট্রাম্প খুবই লেনদেননির্ভর, তার সব কথা শুনতে যুক্তরাজ্য বাধ্য নয় বলে সাফ জানিয়েছেন দেশটির শ্রম ও অবসরবিষয়ক মন্ত্রী প্যাট ম্যাকফাডেন। ফ্রান্স স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা এ অঞ্চলে নতুন করে কোনো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করছে না। জাপান ও অস্ট্রেলিয়া গতকাল জানিয়ে দিয়েছে, এ নৌপথে জাহাজ পাহারা দেয়ার জন্য কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। তেহরানের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, এ সংকটে যদি তৃতীয় কোনো দেশ সরাসরি জড়িয়ে পড়ে বা প্রতিপক্ষকে সহায়তা করে, তবে তাদেরও চরম পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও ঝুঁকির মুখে ট্রাম্প এখন আর যুদ্ধের বোঝা একা বহন করতে চাইছেন না। সে কারণেই তিনি মিত্র দেশগুলোকে সামরিক জোটে টানার চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপকে বহুপাক্ষিকভাবে ভাগ করে নেয়া ও ইরানকে আরো চাপে ফেলার এটি একটি কৌশল বলে মনে করছেন তারা। কিন্তু মিত্রদের অনীহা ইঙ্গিত দিচ্ছে, অনেক দেশই এ সংঘাতকে এখনো মূলত ওয়াশিংটনের যুদ্ধ হিসেবেই দেখছে।
মার্কিন মিত্র দেশগুলো যদি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে সহায়তা না করে, তবে ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ‘খুবই খারাপ’ হবে বলে সতর্ক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানবিরোধী যুদ্ধ প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় দেশগুলোকে সরাসরি যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি এ কড়া বার্তা দিয়েছেন। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি থেকে যারা জ্বালানি সুবিধাভোগী, তাদেরই ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসা উচিত।’
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে এটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যদি তাদের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়া যায়।’ ট্রাম্প অতীতেও ন্যাটোর সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বিশাল সহায়তা করেছে, কিন্তু এখন নিজেদের প্রয়োজনে মিত্রদের পাশে পাচ্ছে না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘকাল ধরে বলে আসছি যে আমরা তাদের পাশে আছি, কিন্তু তারা আমাদের প্রয়োজনে পাশে নেই।’
1
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় চীনের সাহায্য না পেলে বেইজিং সফর পিছিয়ে দেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি মনে করি, চীনেরও সাহায্য করা উচিত। কারণ চীন তাদের তেলের ৯০ শতাংশই এ প্রণালি দিয়ে পায়। তারা যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে সহায়তা না দেয়, তবে আমরা সফর পিছিয়ে দিতে পারি।’ এ মাসের শেষে বেইজিং সফর করার কথা ট্রাম্পের। এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া বিস্তৃত যুদ্ধে যুক্তরাজ্য জড়াবে না বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেছেন, যুক্তরাজ্যের অগ্রাধিকার হচ্ছে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত তার নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। মিত্রদের মধ্যে যারা হরমুজ প্রণালি মুক্ত করতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তার এ হুমকির বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাজ্যের শ্রম ও অবসরবিষয়ক মন্ত্রী প্যাট ম্যাকফাডেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অনুরোধ মেনে নিতে বাধ্য নয় যুক্তরাজ্য। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই লেনদেননির্ভর প্রেসিডেন্সি এবং আমাদের কাজ হলো এর মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা। আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বন্ধুত্ব খুবই গভীর। এটা খুবই ভালো একটা সম্পর্ক।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিত্র দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে হরমুজ প্রণালি আবার উন্মুক্ত করতে একটি জোট গঠনের আহ্বান জানানোর পর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, সংবিধানের যুদ্ধবিরোধী বাধ্যবাধকতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ পাহারা দেয়ার জন্য যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা জাপানের নেই। পার্লামেন্টে তাকাইচি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে পাহারা দেয়ার জন্য জাহাজ পাঠানোর বিষয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। আইনি কাঠামোর মধ্য থেকে জাপান স্বতন্ত্রভাবে কী করতে পারে, আমরা তা খতিয়ে দেখছি।’
জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র গতকাল বলেছেন, ইরানে যুদ্ধের সঙ্গে ন্যাটোর কোনো সম্পর্ক নেই। জার্মানি যুদ্ধ বা সামরিক উপায়ে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার কোনো চেষ্টায় যোগ দেবে না। গ্রিসও হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক তৎপরতায় জড়াবে না বলে জানিয়েছেন গ্রিস সরকারের মুখপাত্র পাভলোস মারিনাকিস।
এদিকে গতকালও ইরান-ইসরায়েলে পাল্টাপাল্টি হামলার নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ইসরায়েলের হোম ফ্রন্ট কমান্ড জানিয়েছে, ইরান থেকে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চল ও জেরুজালেম লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। সতর্কতা জারির পর জেরুজালেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কাতারে ১ ঘণ্টার মধ্যে দুই দফা হামলার সতর্কসংকেত দেয়া হয়। প্রথম দফার কিছু সময় পর কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির সশস্ত্র বাহিনী একটি ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করেছে। এরপর আবার নাগরিকদের ঘরের ভেতরে নিরাপদে থাকার নির্দেশ দিয়ে দ্বিতীয়বার সতর্কতা জারি করা হয়। বাহরাইনেও হামলার সতর্কসংকেত দেয়া হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সতর্কতা সাইরেন সক্রিয় করা হয়েছে এবং নাগরিকদের নিকটতম নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ‘সেজ্জিল’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, এ সলিড-ফুয়েল কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা দুই-আড়াই হাজার কিলোমিটার এবং এর গতি শব্দের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি। একই সময়ে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলের দিকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ৩৭টি ড্রোন ধেয়ে আসে, যেগুলো প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এসব ড্রোন কোত্থেকে পাঠানো হয়েছিল তা জানানো হয়নি। সৌদি আরবে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়েতি অবশ্য বলেছেন, সাম্প্রতিক তেল অবকাঠামোয় হামলার সঙ্গে তেহরানের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের একাধিক শহরে বড় পরিসরে হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ঘোষণা অনুযায়ী, তেহরান, শিরাজ ও তাবরিজে বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে একযোগে হামলা হয়েছে। ইরানের আধা সরকারি ফারস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, তেহরানের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যুৎ বিভাগের একটি ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। তবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। তাবরিজ ইরানের চতুর্থ বৃহত্তম শহর এবং এটি দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তুরস্ক, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের সীমান্তের কাছে অবস্থিত। আর শিরাজ ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।
সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষই কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যতদিন প্রয়োজন তেহরান যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এখন বুঝেছে তারা কেমন জাতির বিরুদ্ধে লড়ছে এবং ইরানিরা আত্মরক্ষার জন্য যেকোনো স্থানে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। অন্যদিকে ইসরায়েলের সংস্কৃতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী মিকি জোহার বলেছেন, চলমান যুদ্ধ আরো কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে এবং আগামী কয়েক দিনে উত্তেজনা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন জানিয়েছেন, ইরানে এখনো হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু রয়েছে এবং সেগুলোর ওপর হামলার পরিকল্পনা অন্তত তিন সপ্তাহের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।


