
ঘাটতি মেটাতে পারে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র রূপপুর থেকে জুনে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনা
মার্চ ৯, ২০২৬
তিন জেলায় দুপুরের মধ্যে বজ্রবৃষ্টিসহ ঝড়ের পূর্বাভাস
মার্চ ৯, ২০২৬সম্প্রতি নারী-পুরুষ সমতা নিয়ে সমাজে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক দেখা গেছে। কেউ কেউ এই ধারণাকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু একটি আধুনিক ও উন্নয়নশীল সমাজে নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আসলে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মূল ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার শামিল। সমতা শুধু একটি সামাজিক বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি নৈতিক ও আদর্শিক একটি মূল্যবোধ। ইতিহাস সাক্ষী, নারীরা সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে আসছেন। বিশ্বের বহু দেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে নারী-পুরুষ সমতার বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবুও বাস্তবতা হলো, সমাজে এখনও নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। এর পেছনে বড় কারণ হলো পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো। অনেক পুরুষ এখনো মনে করেন যে সমাজে পুরুষের কর্তৃত্বই স্বাভাবিক এবং নারীরা তাদের অধীনেই থাকবে। এই মানসিকতা থেকেই নারীর স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয় এবং তাদের বহুমাত্রিক পরিচয়কে সংকীর্ণ করে দেখার চেষ্টা করা হয়। ফলস্বরূপ নারীর প্রতি বিদ্বেষ ও সহিংসতা বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হলেও অধিকাংশ নারী এখনো অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলক কম। কর্মক্ষম নারীদের একটি বড় অংশ সরাসরি আয়ের সঙ্গে যুক্ত নয়। যারা কাজ করেন তাদের বেশিরভাগই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে মজুরি কম এবং সুযোগ-সুবিধা সীমিত। একই ধরনের কাজ করেও নারী-পুরুষের মধ্যে মজুরি বৈষম্য দেখা যায়। ফলে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন না এবং অনেক ক্ষেত্রেই পরিবার বা স্বামীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
নারীর সামাজিক ক্ষমতাহীনতার আরেকটি বড় কারণ হলো শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং বাল্যবিবাহ। অনেক কিশোরী এখনও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে করতে বাধ্য হয়, যার ফলে তাদের শিক্ষা ও স্বপ্ন মাঝপথেই থেমে যায়। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাও নারীর অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের অনেক নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হন। যৌন হয়রানি, অ্যাসিড হামলা এবং ধর্ষণের মতো ঘটনাও সমাজে উদ্বেগজনক হারে ঘটে চলেছে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। অনেক নারী ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অনেক সময় পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেন। রাজনৈতিক দলে নারীর প্রতিনিধিত্বও তুলনামূলক কম। ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর কণ্ঠস্বর যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না।
এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সম্পদের মালিকানায় সমান সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব দূর না হলে উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরে পৌঁছাবে না।
নারী-পুরুষ সমতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়, এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত। সমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে মানবিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেওয়া। তাই রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে যাতে নারীরা তাদের পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে সমাজে এগিয়ে যেতে পারেন। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত হলেই একটি সত্যিকারের সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


