৫৩ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে বদলি
মার্চ ৮, ২০২৬
ওয়ানডে সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে পৌঁছেছে পাকিস্তান ক্রিকেট দল
মার্চ ৮, ২০২৬
৫৩ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে বদলি
মার্চ ৮, ২০২৬
ওয়ানডে সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে পৌঁছেছে পাকিস্তান ক্রিকেট দল
মার্চ ৮, ২০২৬

যে স্থাপনায় হামলা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে পুরো আরব উপসাগরের জীবনযাত্রাকে

যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতে ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলো এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। তেল শোধনাগার, বন্দর বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই এগুলোও এখন কৌশলগত অবকাঠামোর তালিকায়। কারণ কোনো একটি বড় প্ল্যান্ট অচল হয়ে গেলে শুধু শিল্প নয়, লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি সংকট তৈরি হতে পারে।

পারস্য উপসাগর ঘিরে বিস্তৃত মরুভূমির মধ্যে পানিই সবচেয়ে দুর্লভ সম্পদ। বিশাল তেলসম্পদ, উঁচু আকাশচুম্বী শহর, বিশ্ববাণিজ্যের ব্যস্ত বন্দর সবকিছুর মাঝেও এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোতে বড় অভাব—প্রাকৃতিক মিঠা পানির উৎস এখানে প্রায় নেই বললেই চলে। নদী নেই, স্থায়ী হ্রদ নেই, বৃষ্টিপাত অল্প, আর ভূগর্ভস্থ পানিও সীমিত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে জীবনযাত্রা, কৃষি, শিল্প এমনকি নগরায়ণের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখতে যে প্রযুক্তির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করতে হয়েছে, সেটিই হলো সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধন যাকে বলা হয় ‘ডেসালিনেশন’।

সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। নয় দিন ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে বাহরাইন জানিয়েছে, একটি ইরানি ড্রোন তাদের একটি পানিশোধন কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। একই সময় ইরানও দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দক্ষিণাঞ্চলের কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি ডেসালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে। এ ধরনের অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ভেতর দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট শুধু পানির উৎস নয়; এটি এখন কৌশলগত অবকাঠামোও।

পারস্য উপসাগরের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক পানির ঘাটতি এতটাই প্রকট যে শহরের প্রতিটি কল থেকে যে পানি বের হয়, তার বড় অংশই আসলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি থেকে তৈরি। সমুদ্রের পানি সংগ্রহ করে তা বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে লবণ ও অন্যান্য খনিজ থেকে মুক্ত করা হয়, তারপর সেই পানি শহর, শিল্প ও কৃষিতে সরবরাহ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শক্তি-নির্ভর। প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে, বিশাল অবকাঠামো লাগে, এবং স্থায়ীভাবে চালু রাখতে প্রয়োজন জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরব সেন্টারের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিসিসিভুক্ত দেশগুলো বর্তমানে বিশ্বের মোট পানিশোধন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশের মালিক। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় এখানে সমুদ্রের পানি মিঠা করার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। শুধু সক্ষমতাই নয়, বাস্তবে উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এ অঞ্চল এগিয়ে। বিশ্বে উৎপাদিত মোট ডেসালিনেটেড পানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।

এ অঞ্চলে বর্তমানে চার শতাধিক ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট চালু রয়েছে। এগুলো মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার এবং বাহরাইনে বিস্তৃত। মরুভূমির ভেতরে গড়ে ওঠা আধুনিক নগর যেমন রিয়াদ, দুবাই, দোহা, কুয়েত সিটি কিংবা মানামা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই এ প্ল্যান্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল।

পরিসংখ্যান দেখলে নির্ভরতার মাত্রা আরো পরিষ্কার হয়ে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যবহৃত পানির প্রায় ৪২ শতাংশ আসে ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট থেকে। কুয়েতে এই নির্ভরতা আরো বেশি। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশ পানিই সমুদ্রের পানি থেকে তৈরি। ওমানে প্রায় ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবে প্রায় ৭০ শতাংশ পানির উৎসও এই প্রযুক্তি। অর্থাৎ এই প্ল্যান্টগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কয়েক দিনের মধ্যেই বড় বড় শহর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে।

এ খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী দেশ সৌদি আরব। দেশটি একাই পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি ডেসালিনেটেড পানি উৎপাদন করে। নতুন প্রকল্পে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে তারা উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির দৈনিক পানিশোধন সক্ষমতা প্রায় ৮.৫ মিলিয়ন ঘনমিটার—অর্থাৎ প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট—এ পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এ প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু জটিল বাস্তবতাও। প্রথমত, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ডেসালিনেশন প্রক্রিয়ায় বিপুল শক্তি খরচ হয়, যার বড় অংশ আসে তেল ও গ্যাস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে। ফলে পানির সঙ্গে জ্বালানি অর্থনীতিও এখানে গভীরভাবে যুক্ত। দ্বিতীয়ত, পরিবেশগত প্রভাবও রয়েছে। সমুদ্র থেকে পানি তুলে লবণ আলাদা করার পর যে ঘন লবণাক্ত বর্জ্য তৈরি হয়, তা আবার সমুদ্রে ফেরত পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়া সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন।

তারপরও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য বিকল্প খুব কম। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে যাচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, আর জনসংখ্যা ও নগরায়ণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাহিদাও বাড়ছে। ফলে ডেসালিনেশন প্রযুক্তি এখন শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি কার্যত এ অঞ্চলের অস্তিত্ব রক্ষার প্রযুক্তি।

এ কারণেই যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতে ডেসালিনেশন প্ল্যান্টগুলো এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। তেল শোধনাগার, বন্দর বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতোই এগুলোও এখন কৌশলগত অবকাঠামোর তালিকায়। কারণ কোনো একটি বড় প্ল্যান্ট অচল হয়ে গেলে শুধু শিল্প নয়, লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি সংকট তৈরি হতে পারে।

পারস্য উপসাগরের মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিক শহরগুলোকে টিকিয়ে রাখার পেছনে বড় অবদান সমুদ্রের নোনা পানিকে মিঠা করার সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যুদ্ধের ধোঁয়া আর ড্রোন হামলার খবরের মাঝেও এই বাস্তবতাটি মনে করিয়ে দেয়, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পানি কখনো কখনো তেলের মতোই কৌশলগত সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *