সিটি ব্যাংকের ২২৭ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় মাইলস্টোনের সাফল্য
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬
সিটি ব্যাংকের ২২৭ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় মাইলস্টোনের সাফল্য
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬

ইসলামপুরে জমে ওঠেনি ঈদবাজার লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও কম বিক্রি

রাজধানীর চিটাগং সড়কের একটি অভিজাত শপিং মলের কাপড় বিক্রেতা আবদুল হাকিম।

২০ বছরের ব্যবসায়ী জীবনে এবারই প্রথম তিনি ইসলামপুর থেকে কোনো কাপড় সংগ্রহ করেননি। তার ভাষ্য, ‘পুরান ঢাকায় যাওয়া-আসা বেশ কষ্টসাধ্য। কাছেই নরসিংদীর একাধিক বড় বাজার রয়েছে, যেখানে কাপড়ের মান ভালো ও দাম কম হওয়ায় ইসলামপুর থেকে এবার কোনো কিছু কেনা হয়নি।’

শুধু আবদুল হাকিম নয়, দেশের কাপড় ব্যবসায়ীদের বড় একটা অংশই ইসলামপুরবিমুখ হয়েছেন। এর অন্যতম কারণ হলো পাইকারি কাপড়ের বাজার বিস্তৃত হয়েছে ঢাকার বাইরেও। বিশেষ করে গাউসিয়া, চাঁদনী চক, বাবুবাজার, কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরের পাইকারি মার্কেটগুলোয় ক্রেতারা ছড়িয়ে পড়েছেন। যে কারণে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা ইসলামপুরে এসে ভিড় জমাতে আগ্রহী নয়।

এ বছর ঈদের বাজার কেমন জানতে চাইলে ইসলামপুরের বাবুলি মার্কেটের এস টেক্স ইনসাফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বাকি বিল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার ব্যবসা নেই বললেই চলে। আমাদের ব্যবসা মূলত রমজান মাসের আগেই জমে ওঠে, ১৫ তারিখ পর্যন্ত মার্কেট জমজমাট থাকে। রমজানের নবম দিন চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা সে অর্থে কোনো বেচাকেনাই করতে পারিনি।’

একই মার্কেটের মরিয়ম ফ্যাব্রিকসের স্বত্বাধিকারী মো. মাহবুব বলেন, ‘নানা কারণেই ইসলামপুরের পাইকারি ব্যবসা জৌলুস হারিয়েছে। এর মধ্যে বড় কারণ হলো ঢাকার পাশেই এখন বড় বড় পাইকারি মার্কেট ও কারখানা গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে নরসিংদীর বাবুরহাট ও ভুলতার গাউসিয়া মার্কেটের কারণে আমাদের এখানে ক্রেতাদের আনাগোনা অনেকটাই কমে গেছে।’

নতুন মার্কেট তৈরি হওয়ায় ক্রেতারা ইসলামপুর আসতে চান না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আসলে ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে ইসলামপুর আসা বেশ কষ্টসাধ্য। এখানে আদালত, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সদরঘাট, হাসপাতাল সব মিলিয়ে এলাকায় প্রচুর যানজট থাকে। যে কারণে মানুষ বিপদে না পড়লে পুরান ঢাকায় ঢুকতে চায় না।’

জানা যায়, মোগল আমলে বাংলার সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতির নামানুসারে এ এলাকার নামকরণ হয়েছে ইসলামপুর। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ১৭৭৩ সাল থেকে এখানে কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা শুরু হয়। এর আগে ইসলামপুরে ফলের ব্যবসাই ছিল প্রধান। সে জন্য এলাকাটিকে ‘আমপট্টি’ বলা হতো। তাই ঐতিহাসিক বিবেচনায় ইসলামপুরকে বাংলাদেশে কাপড়ের ব্যবসার সবচেয়ে প্রাচীন কেন্দ্র বলে ধারণা করা হয়। এখানকার কাপড়ের ব্যবসা একপর্যায়ে সদরঘাটসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে এসব এলাকায় বিক্রমপুর গার্ডেন সিটি, গুলশান আরা সিটি, সাউথ প্লাজা, জাহাঙ্গীর টাওয়ার, চায়না মার্কেটসহ ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক মার্কেটে পোশাক ও কাপড় বেচাকেনা হয়। মার্কেটগুলোয় সব মিলিয়ে দোকানের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

ইসলামপুরে দেশী-বিদেশী থান কাপড় থেকে শুরু করে থ্রি-পিস, শাড়ি, লুঙ্গি, বাচ্চাদের পোশাক, বিছানার চাদর, পর্দার কাপড় ইত্যাদি পাওয়া যায়। এছাড়া বোতাম, জিপার, ইলাস্টিকসহ পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ ও সরঞ্জামও রয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ইসলামপুরের ব্যবসায়ী নেতারা জানান, কয়েক বছর আগেও এখানে বছরে ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা ছিল, যার বড় অংশই হতো রমজানে।

ইসলামপুরের হাবিবুল্লাহ মার্কেটের ফরিদ এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মো. বাপ্পী বলেন, ‘এ বছর আমাদের টার্গেট যা ছিল তার ২০ শতাংশও বিক্রি করতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যবসায়িক লস হিসেবেই ধরতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে তো ব্যবসা চালানো কষ্ট হয়ে যাবে।’

এবার ব্যবসা কম হওয়ার পেছনে নির্বাচনী পরিস্থিতিও বড় কারণ বলে দাবি করেন প্যারাডাইস মার্কেটের তৈয়ব টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী বাপ্পী। তিনি বলেন, ‘আমাদের টার্গেট ছিল দেড় কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করা। কিন্তু অনেকেই নির্বাচনী অস্থিরতার কথা ভেবে বড় বিনিয়োগে যাননি। আমরা এখন পর্যন্ত ২০ লাখ টাকার মতো বিক্রি করতে পেরেছি। অর্ধেকের ধারেকাছেও যেতে পারিনি। সবার অবস্থা প্রায় একই রকম।’

বর্তমানে ইসলামপুরের জৌলুস কমে এসেছে বলে মনে করেন চার দশকের ব্যবসায়ী সামছুল আলম। তিনি ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসয়ী সমিতির সাবেক সভাপতিও। তার ভাষ্য, ‘ইসলামপুরে যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যবসায়ীই ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার পর্যায়ে রয়েছেন।’ এর পেছনে নানা কারণের মধ্যে যানজট অন্যতম বলে মনে করেন তিনি।

বিকল্প মার্কেট তৈরি হওয়া নগর পরিকল্পনার স্বাভাবিক পরিণতি বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘একটা শহর যখন মরে যায় তখন তার ব্যবসার জৌলুসও হারিয়ে যায়। এটাকে বলা হয় ‘ডিজ ইকোনমিকস অব স্কেল’। নগর যখন সম্প্রসারণ হয় তখন নতুন নতুন ব্যবসার কেন্দ্র তৈরি হয়। সে নিয়মেই ঢাকার পার্শ্ববর্তী জায়গাগুলোয় ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ইসলামপুর নয় ঢাকার পুরনো যত ব্যবসা কেন্দ্র আছে সবগুলোই ধীরে ধীরে মরে গেছে। হয়তো মানুষ বেশি বলে তা বোঝা যাচ্ছে না। নগর পরিকল্পনার দৃষ্টিতে এটা স্বাভাবিক ঘটনা।’ এমন পরিস্থিতিতে ইসলামপুরের মতো বড় মার্কেটগুলোর ব্যবসায়ীদের বিকল্প কিছু ভাবা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *