
ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ‘খুশি নন’ ট্রাম্প, তবু সময় বাড়ানোর ইঙ্গিত
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬
সাপ্তাহিক পুঁজিবাজার ডিএসইএক্স বেড়েছে প্রায় আড়াই শতাংশ
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রমেই কাবুলের সঙ্গে সম্পর্কে অবনতি ঘটছিল পাকিস্তানের। এতদিন মাঝেমধ্যে সীমান্তে গোলাগুলি ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটলেও তা সীমিত পরিসরেই ছিল।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মর্টার শেল ও সরাসরি সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে দেশ দুটি। ইসলামাবাদ এটিকে প্রকাশ্য যুদ্ধাবস্থা বলে অভিহিত করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, ‘এখন এটি প্রকাশ্য যুদ্ধ। ভারতের প্রক্সি তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ণ মাত্রায় পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।’
গতকাল আফগান বাহিনী সীমান্তের কাছাকাছি পাকিস্তানের সামরিক অবস্থানে হামলা চালায়। প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে বিমান হামলা শুরু করে। রাজধানী কাবুলসহ অন্যান্য শহরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, পাকিস্তানি বিমান হামলায় আফগানিস্তানের ২২টি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। এতে ২৭৪ জন তালেবান কর্মকর্তা ও যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলেও দাবি তার। একই সময়ে অন্তত ১২ জন পাকিস্তানি সেনাও নিহত হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, পাল্টা অভিযানে ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং ১৯টি সামরিক পোস্ট দখল করা হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানি বাহিনী কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়ার বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালায় এবং গতকাল পাকতিয়া, পাকতিকা, খোস্ত ও লাগমান প্রদেশেও হামলা হয়। রাতের হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করলেও শুক্রবারের হামলায় বেসামরিক হতাহতের কথা স্বীকার করেন মুজাহিদ, তবে তিনি কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেননি। তিনি আরো জানান, প্রায় ২ ঘণ্টা স্থায়ী পাল্টা অভিযানে ১৩ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত ও ১২ জন আহত হয়েছেন।
আফগানিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের যেকোনো অপতৎপরতায় ইসলামাবাদের নীতি ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা)। তিনি বলেন, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী সবসময় দেশ রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত। পাকিস্তান জানে কীভাবে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আফগানিস্তানের সেনাপ্রধান ফসিউদ্দিন ফিতরাত। আল জাজিরার খবরে বলা হয়, আফগান সেনাপ্রধান বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো হামলার ক্ষেত্রে পাকিস্তান আরো শক্তিশালী এবং দৃঢ় ও কার্যকর জবাব পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সংঘাত পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। সীমান্তে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।
কিন্তু এ হামলার নেপথ্যে কী? ইসলামাবাদের প্রধান অভিযোগ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধারা আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় পাচ্ছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আত্মঘাতী হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আক্রমণের সঙ্গে আফগান ঘাঁটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে পাকিস্তান দাবি করছে। অন্যদিকে কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, পাকিস্তানই তাদের শত্রু ইসলামিক স্টেটের সদস্যদের আশ্রয় দিচ্ছে।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জঙ্গি হামলায় সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে ১২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ নিজেই এক পর্যায়ে এ পরিস্থিতিকে ‘ব্লোব্যাক’ বা অতীতে তালেবানদের পৃষ্ঠপোষকতা নীতির প্রতিক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছেন।
পাকিস্তানি তালেবান হিসেবে পরিচিতি টিটিপি ২০০৭ সালে গঠিত হয়। আফগান তালেবানের সঙ্গে মতাদর্শিক ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। তারা পাকিস্তানের বাজার, মসজিদ, বিমানবন্দর, সামরিক ঘাঁটি ও স্কুলে হামলা চালিয়েছে। আফগান যুদ্ধে তারা তালেবানের সঙ্গে লড়েছে এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের মুখে অনেক সদস্য আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে।
সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে দুই দেশের মধ্যে বড় অসমতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার সক্রিয় সেনা রয়েছে, সঙ্গে রয়েছে শক্তিশালী বিমান ও নৌবাহিনী এবং পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। বিপরীতে আফগান তালেবানের বাহিনী সংখ্যা ও সরঞ্জামে অনেক দুর্বল; কার্যকর বিমান বাহিনী নেই, ভারী অস্ত্রও সীমিত। তবে দীর্ঘ গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের প্রধান শক্তি। সীমান্তবর্তী দুর্গম ভূখণ্ডে গেরিলা কৌশল ব্যবহার করে তালেবানরা পাল্টা হামলা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক আবদুল বাসিত বলেছেন, আফগান তালেবানের সম্ভাব্য প্রতিশোধ পাকিস্তানের নগর কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে, যা চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে এবং জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোকে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেবে। তার মতে, ড্রোন ও আত্মঘাতী হামলার মতো কৌশল এ সংঘর্ষকে আরো জটিল করে তুলতে পারে।
বড় আকারে সংঘাত ছড়ানোর আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক সামিনা আহমেদ। তার মতে, আফগান ভূখণ্ডে টিটিপি নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পাকিস্তান আবারো সামরিক পদক্ষেপ নেবে বলে স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাই তুরস্ক, কাতার ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান তার ভূখণ্ডে জঙ্গি হামলা বন্ধ করতে আরো কঠোর সামরিক অভিযান চালাতে পারে, আর তালেবান সীমান্ত পোস্টে আক্রমণ ও অনুপ্রবেশ বাড়াতে পারে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে, যার প্রভাব পড়বে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর। একসময়ের কৌশলগত দুই মিত্রের এ রূপান্তর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা করবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।


