তারেক রহমানের ছেড়ে দেয়া আসনে বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬
‘বর্তমান বিরোধী দলকে গৃহপালিত দল মনে করলে ভুল করবে সরকার’
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬
তারেক রহমানের ছেড়ে দেয়া আসনে বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬
‘বর্তমান বিরোধী দলকে গৃহপালিত দল মনে করলে ভুল করবে সরকার’
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি: ৯৩২ সংগঠন জড়িত, সংকটে যাত্রী ও চালক

দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ নির্ভর করছে সড়কপথের পরিবহন ব্যবস্থার ওপর। মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে বাস ও ট্রাক। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটিই এখন চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্যের কবলে পড়ে ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে।

সম্প্রতি এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের সড়ক ও পরিবহন খাতে সক্রিয় প্রায় ৯৩২টি মালিক-শ্রমিক সংগঠন আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে চাঁদাবাজি বা উৎকোচের ওপর নির্ভরশীল। এসব সংগঠন সড়কে কার্যত অদৃশ্য টোল প্লাজার মতো কাজ করছে। চাঁদা না দিলে অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির চাকা ঘোরে না।

তথ্য অনুযায়ী, যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে চাঁদা আদায়ের ধরন আলাদা। বাস পরিবহনের ক্ষেত্রে রুট মালিক সমিতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে চাঁদা আদায় করা হয়। পরিবহন পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার অজুহাতে প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক বা মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই অর্থ আদায়ের পেছনে কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই।

অন্যদিকে, পণ্যবাহী ট্রাকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ট্রাকে পণ্য ওঠানোর সময় থেকেই শুরু হয় চাঁদাবাজি। কোথাও শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডের নামে, কোথাও নিরাপত্তা ফি বা ব্যবস্থাপনা খরচের অজুহাতে টাকা আদায় করা হচ্ছে। আবার অনেক জায়গায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে নগদ অর্থ নেওয়া হয়। কোথাও সংগঠনের ব্যানারে মাসিক চুক্তির মাধ্যমে টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে ট্রাক মালিকদের।

চাঁদাবাজির এই টাকা বিভিন্ন স্তরে ভাগবাঁটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় নেতা, মালিক-শ্রমিক সংগঠন, টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ এমনকি পরিবহন তদারকি সংস্থার কিছু অসাধু সদস্য পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

শুধু তাই নয়, সড়ক-মহাসড়কে দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং থানা পুলিশের একটি অংশও নানা অজুহাতে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই চাঁদা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। অতিরিক্ত এই ব্যয় সমন্বয় করতে পরিবহন মালিকরা ভাড়া বাড়াচ্ছেন। এতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, যাত্রীদের বহন করতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির মূল কারণ হলো দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাব। খাতটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে আইনের কঠোর প্রয়োগ ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। তারা মনে করেন, সরকারের শুরু থেকেই শক্ত বার্তা দেওয়া জরুরি যে সড়কে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না।

সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর একটি বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওই বক্তব্যে চাঁদা ও চাঁদাবাজির পার্থক্য নিয়ে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা অনেকের কাছে চাঁদাবাজিকে ন্যায্যতা দেওয়ার শামিল বলে মনে হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদাবাজি একটি গণবিরোধী কাজ এবং এটি কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তারা আরও বলেন, উন্নত দেশের উদাহরণ দিয়ে আমাদের অবকাঠামোর তুলনা করা হলেও বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে হঠাৎ করে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বরং বিদ্যমান অবকাঠামোর মধ্যে শৃঙ্খলা ফেরানোই এখন সবচেয়ে জরুরি।

ব্রাজিল ও পেরুতে এমআরটি ও মেট্রোনির্ভর অবকাঠামো চালুর ফলে সড়ক ব্যবস্থাপনার ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশেও মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ের মতো অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, যা সঠিক ব্যবস্থাপনায় বহুমুখী সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক ও ডিজিটাল করতে হবে। রুট পারমিট, চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছু এক ছাতার নিচে এনে সমন্বয় বাড়াতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের কার্যক্রমকে জবাবদিহির আওতায় আনাও জরুরি।

তারা আরও বলেন, নগরে চালকদের দৈনিক জমাভিত্তিক বাস ইজারা প্রথা বন্ধ করতে হবে। এতে চালকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং তারা নিয়ম ভাঙতে বাধ্য হন। পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও নির্দিষ্ট মাসিক বেতন নিশ্চিত করাই প্রকৃত শ্রমিক কল্যাণ।

অতীতে বিভিন্ন সময়ে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা দেখা গেছে। নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ করলেও কোনো সরকারই কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এর ফলে সড়কে নৈরাজ্য এখন প্রায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন সড়ক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন এবং যাত্রীদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়।

তাদের মতে, যেহেতু সড়কে নৈরাজ্যের কারণগুলো চিহ্নিত, তাই এর সমাধানও অসম্ভব নয়। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *