
নির্বাচন ২০২৬: জামায়াত-বিএনপির তুমুল সংঘর্ষে অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬
ভোটের মাঠে নামছে সেনাসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী
ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২৬বগুড়ার একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন মধ্যবয়সী মানুষ মোবাইলের পর্দায় লুডু খেলছিলেন। পাশেই তরুণদের একটি জটলা একটি ভিডিও নিয়ে উত্তেজিত আলোচনা করছিল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছিল একজন পরিচিত রাজনৈতিক নেতা কথা বলছেন—গলার আওয়াজ, মুখের ভঙ্গি, এমনকি বলার ঢংও একেবারে বাস্তব। কিন্তু তিনি যে কথাগুলো বলছেন, সেগুলো তিনি কখনো বলেননি। ভিডিওটি তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে। উপস্থিত কেউই বুঝতে পারছিল না এটি ভুয়া।
১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এ ধরনের ভুয়া ভিডিও ও অডিওর সংখ্যা বাড়ছে। প্রযুক্তির এই অপব্যবহার শুধু নির্বাচনী কৌশল নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর সরাসরি আঘাত। যখন প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য না বুঝতে পারলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
গত দুই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র এক মাসে ৯৭টি এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে। এগুলো ছড়িয়েছে অন্তত ৬১৫টি পর্যবেক্ষণাধীন পেজ ও প্রোফাইল থেকে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এসব কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে—ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করতে।
রাজনৈতিক নেতাদের মুখে ভুয়া বক্তব্য বসানো হচ্ছে, তাঁদের ছবি বিকৃত করা হচ্ছে, এমনকি কণ্ঠস্বর নকল করে অডিও বানানো হচ্ছে। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সাধারণ মানুষ প্রথম দেখায় বুঝতেই পারেন না এটি ভুয়া। ফলে বিভ্রান্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারাও। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে তৈরি একটি ডিপফেক ভিডিওতে তাঁকে জুয়া খেলার আমন্ত্রণ জানাতে দেখা যায়। তাঁর প্রেস উইং জানিয়েছে, জুয়ার চক্র বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের ভিডিও ছড়াচ্ছে। এগুলো দেখতে সংবাদ প্রতিবেদনের মতো হলেও আসলে মানুষকে জুয়ার সাইটে টেনে নেওয়ার ফাঁদ।
অন্য এক শীর্ষ নেতাকে নিয়েও একাধিক ডিপফেক ভিডিও তৈরি হয়েছে, যেখানে তাঁকে গাজা ইস্যুতে নীরব থাকার পরামর্শ দিতে দেখা যায়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা ফ্যাক্ট ওয়াচ ও ডিসমিসল্যাব এসব ভিডিওকে ভুয়া বলে শনাক্ত করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নারী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার। ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে দুই নির্দলীয় প্রার্থী—আবদুল্লাহ নাহিদ নিগার ও বিউটি বেগম—ডিপফেক ভিডিওর শিকার হন। ভোটের দিন তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেখিয়ে ভিডিও ছড়ানো হয়। ডিসমিসল্যাব নিশ্চিত করেছে, স্থির ছবি ও কৃত্রিম কণ্ঠ ব্যবহার করে এসব ভিডিও তৈরি করা হয়েছিল। নাহিদ নিগার জয় পেলেও বিউটি বেগম মাত্র তিন হাজার ভোটে পরাজিত হন। এই ফলাফলে ভুয়া ভিডিওর প্রভাব ছিল কি না—সে প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।
প্রযুক্তির এই অপব্যবহার শুধু প্রার্থীদের ক্ষতি করছে না, ভোটারদের মনেও বিভ্রান্তি তৈরি করছে। মানুষ যদি বিশ্বাস করে কোনো নেতা এমন কিছু বলেছেন যা তিনি আদৌ বলেননি, তাহলে ক্ষোভ জন্মায়। ক্ষোভ থেকে সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় গুজব ও ভুয়া তথ্যের ভূমিকা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
নির্বাচনের আগে মাত্র দশ দিন সময় বাকি। এই সময়ে নির্বাচন কমিশনের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অবিলম্বে একটি ইলেকশন সাইবার সিকিউরিটি ও ডিসইনফরমেশন মনিটরিং সেল গঠন করে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ভুয়া কনটেন্ট দ্রুত সরাতে হবে।
সম্পাদকীয় হিসেবে আমাদের মত হলো, প্রযুক্তি যেমন উন্নতির হাতিয়ার, তেমনি ভুল হাতে পড়লে তা গণতন্ত্রের শত্রু হয়ে ওঠে। আসন্ন নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে এআই-নির্ভর অপপ্রচার বন্ধ করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই এই মুহূর্তে গণতন্ত্র রক্ষার প্রধান শর্ত।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


