
গ্রামীণফোনের ১০৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা
ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬
ইশতেহার ঘোষণা করছে জামায়াত
ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে বডি ওর্ন ক্যামেরা, ড্রোন ও একটি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) ব্যবহার করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে বডি ওর্ন ক্যামেরা, ড্রোন ও একটি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) ব্যবহার করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬ অ্যাপ’। পুলিশ, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবহারের জন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রেসপন্ডার হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের পাশাপাশি রিটার্নিং অফিসাররা এ অ্যাপ ব্যবহার করবেন। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তবে এ নিরাপত্তা পরিকল্পনায় যথেষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকলে হ্যাকারদের কবলে পড়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, নির্বাচনের সময় কেন্দ্রের পরিস্থিতি জানাতে ব্যবহার করা হবে ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ। এ অ্যাপ ব্যবহার করবেন মোট ১ লাখ ২৮ হাজার ২৮৩ আনসার সদস্য। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনজন করে ব্যবহারকারী থাকবেন। কেন্দ্রে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতির তথ্য অ্যাপে দিলে সংশ্লিষ্ট মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে। অ্যাপটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত ১৬ জানুয়ারি। এ অ্যাপ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, যার ফলে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত যেকোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন তৈরি এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সময় আকাশপথে নজরদারির জন্য বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মোট ৪১৮টি ড্রোন ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী ২০০টি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ১০০টি, বাংলাদেশ পুলিশ ৫০টি, কোস্টগার্ড ২০টি; নৌবাহিনী, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ১৬টি করে ব্যবহার করবে। বডি ওর্ন ক্যামেরা, ড্রোন ও একটি কেন্দ্রীভূত নিরাপত্তা অ্যাপের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫ হাজার ৫০০ বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবে পুলিশ। এর মধ্যে ১৫ হাজার ক্যামেরা থাকবে অনলাইনে। ১০ হাজার অফলাইনে। অনলাইনে থাকা ক্যামেরা দিয়ে লাইভ স্ট্রিমিং করা যাবে। এজন্য একটি স্বতন্ত্র সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে পুলিশ সদর দপ্তর। সাইবার হামলার মাধ্যমে হ্যাকিং করে কোনো হ্যাকার যাতে এ অনলাইন নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করতে না পারে এজন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে পুলিশ সদর দপ্তর। সন্দেহজনক কোনো ট্রাফিক এ নেটওয়ার্কে এলে অ্যালার্ট ও অটো ব্লকের ব্যবস্থা থাকবে। হ্যাকিং প্রতিরোধের শক্তিশালী ব্যবস্থাও থাকছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অনলাইনে বডি ওর্ন ক্যামেরার জন্য ডকিং স্টেশন, সার্ভার ও ক্লাউডভিত্তিক ডেটা ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এ নেটওয়ার্কের যেকোনো স্তরে নিরাপত্তা দুর্বল হলে ভোটের সংবেদনশীল ভিডিও ফাঁস, প্রমাণ নষ্ট কিংবা তথ্য বিকৃতির ঘটনা ঘটতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখেই বডি ওর্ন ক্যামেরার অনলাইন নেটওয়ার্কে শক্তিশালী নিরাপত্তা সলিউশন ব্যবহার করা হবে, যার মাধ্যমে যেকোনো ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবেলা করা হবে। সন্দেহজনক কোনো ডেটা অনুপ্রবেশ করতে দেয়া হবে না। শুধু বাইরের সাইবার হামলায় নয়, ভেতরের অপব্যবহার ঠেকাতে অনুমোদিত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা কখন কোন ভিডিও দেখবেন, কপি করবেন বা ব্যবহার করবেন এসব বিষয় নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করবে পুলিশ সদর দপ্তর। এজন্য ভিডিও ডেটা ব্যবহারে মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু এবং প্রতিটি অ্যাকসেসের অডিট লগ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এসব লগ পরিবর্তন বা মুছে ফেলার সুযোগ থাকবে না।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলেছে, বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য দেশের প্রতিটি থানায় একটি ডকিং বা ডক স্টেশন থাকবে। প্রতিটি ডক স্টেশন একেকটি ডিজিটাল প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। থানার নির্ধারিত পুলিশ কর্মকর্তা এ প্লাটফর্মে বসে নজরদারি করবেন ভোটের মাঠে থাকা বডি ওর্ন ক্যামেরার। এছাড়া সব পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের দপ্তরে পৃথক ডক স্টেশন প্লাটফর্ম থাকবে। এজন্য সারা দেশে মোট ৭২০টি ইউজার প্লাটফর্ম বসানো হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের কমান্ড সেন্টার থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের জন্য তারা ডিএমপির প্রতিটি থানায় একটি করে ডক স্টেশন স্থাপন করছেন। এ ডক স্টেশন সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার ভোট কেন্দ্রগুলোয় থাকা বডি ওর্ন ক্যামেরাগুলোর ব্যবহার তদারকি ও নজরদারি করবেন থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।’
পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ ও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোয় বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে ১৫ হাজার ক্যামেরায় সিম কার্ড সংযুক্ত থাকবে, যাতে ইন্টারনেট সংযোগ থাকবে। কোনো ভোট কেন্দ্রে গোলযোগ হলে এসওএস পাঠানোর মাধ্যমে এসব ক্যামেরা থেকে সরাসরি ইন্টারনেটের মাধ্যমে লাইভ স্ট্রিমিং করা যাবে। সার্বক্ষণিক লাইভ ছবি ও ভিডিও দেখার ব্যবস্থা থাকবে। ভোট কেন্দ্রের যেকোনো ঘটনার দৃশ্য এ ক্যামেরায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড হয়ে যাবে। এছাড়া ভোট কেন্দ্রের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারবে নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ভোটগ্রহণকালে পুলিশ সদর দপ্তরের কমান্ড সেন্টার থেকে বডি ওর্ন ক্যামেরা সরাসরি ভোট কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ভোট কেন্দ্রের যেকোনো বিতর্কিত ঘটনার সমাধানে সহায়ক হতে পারে বডি ওর্ন ক্যামেরার ছবি ও ফুটেজ। ভোট কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে যেকোনো ঘটনার ফুটেজ এভিডেন্স হিসেবে বডি ওর্ন ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে সংরক্ষিত থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সেই ফুটেজ কাজে লাগাতে পারবেন সংশ্লিষ্টরা।’
সরকারের প্রযুক্তনির্ভর নিরাপত্তা প্রস্তুতিকে স্বাগত জানালেও এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ যত্নবান থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবেই এখন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অ্যাপ বা সোশ্যাল প্লাটফর্মের ব্যবহার শুরু হয়েছে। সেখান থেকে আমাদের এখানেও করা হয়েছে। সরকারের প্রযুক্তনির্ভর নিরাপত্তা প্রস্তুতিকে স্বাগত জানাই। তবে এর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটিমুক্ত ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বডি ওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহার করবে। সবই ভালো উদ্যেগ। কিন্তু ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ করে চূড়ান্ত প্রয়োগের ক্ষেত্রে যেন কোনো ত্রুটি না ঘটে, আমাদের তেমন প্রস্তুতি রাখতে হবে। এটা করতে না পারলে কিন্তু মানুষের আস্থার জায়গাটা নড়বড়ে হবে।’
আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে পুলিশ সদস্যদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং যথাযথ প্রয়োগের বিষয়েও তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ভোট ও ভোটারের সুরক্ষায় সর্বাত্মকভাবে সচেষ্ট থাকবেন। আর প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ত্রুটিমুক্ত রাখতেও যথাযথ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।’


