
অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালে আলকারাজ ও জোকোভিচ
জানুয়ারি ৩১, ২০২৬
গণভোটের রায় যাই হোক সংসদেরই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থাকবে
ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্দোলনের পরপরই অনেকেই এটিকে ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ কিংবা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ হিসেবে আখ্যা দেন। স্বৈরশাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় দেশজুড়ে তৈরি হয় নতুন আশাবাদ। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আশাবাদ বাস্তবতার কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী অনেকেই এখন বলছেন, প্রাথমিকভাবে সম্ভাবনা উজ্জ্বল মনে হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত তরল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। অনেকে আশঙ্কা করছেন, অভ্যুত্থানের অর্জনগুলো হারিয়ে যেতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, সঠিক পথে পরিচালিত হলে এটি গণতান্ত্রিক সংস্কারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে প্রশ্ন
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, এই সরকার প্রকৃতপক্ষে গণ-অভ্যুত্থানের ফল নাকি শাসক শ্রেণির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব মীমাংসার ফল। সমালোচকদের মতে, সেনাবাহিনী, দেশীয় ডানপন্থী শক্তি ও বিদেশি শক্তির সমর্থনে এই সরকার গঠিত হয়েছে।
এ সরকার কেবল ছাত্র আন্দোলন বা বামপন্থীদের সমর্থনে গঠিত হয়নি—এটি এখন স্পষ্ট। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ শাসক শ্রেণির বিভিন্ন অংশ এই সরকারের কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি নিজেকে মধ্যপন্থী দাবি করলেও দলটির ভেতরে বাম, ডান ও ধর্মীয় প্রবণতার মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে, যা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে অস্পষ্ট করে তুলেছে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ‘রঙিন বিপ্লব’ প্রসঙ্গ
কিছু বিশ্লেষক এই পরিবর্তনকে ‘রঙিন বিপ্লব’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। তাদের মতে, ইউক্রেন বা আরব বসন্তের মতো বাংলাদেশেও বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থাকতে পারে। মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের নামে বিদেশি আর্থিক সহায়তা ও এনজিও কার্যক্রমকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। যদিও এই তত্ত্ব পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবে আংশিকভাবে মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে।
এই বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এর ফল হতে পারে এক ডানপন্থী সরকারের পরিবর্তে আরেক ডানপন্থী বা আরও প্রো-পশ্চিমা সরকারের প্রতিষ্ঠা।
ভবিষ্যৎ রাজনীতির চ্যালেঞ্জ
গণ-অভ্যুত্থানের মূল প্রশ্ন এখন—দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো কীভাবে তাদের লক্ষ্য অর্জন করবে? যারা স্বৈরতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে চান, সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব কমাতে চান এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অবসান চান—তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঐক্য গড়ে তোলা।
বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ‘দুঃশাসন হটাও, ব্যবস্থা বদলাও’ স্লোগান দিয়ে আসছে। তবে তারা এখনো কার্যকর বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি সংবিধানের চার মূলনীতির মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ বাদ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এর পরিবর্তে তারা সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার মতো বিমূর্ত ধারণা যুক্ত করেছে।
এতে বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সঙ্গে তাদের মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ধারণা একে অপরের পরিপন্থী—এই বাস্তবতা আবার সামনে এসেছে।
গণভোট ও নির্বাচন
বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সরকার সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট আদায়ে সচেষ্ট। তবে অনেক দল মনে করছে, সংসদই সংস্কারের বৈধ ক্ষেত্র। বামপন্থীরা গণভোটকে অপ্রয়োজনীয় বলেছে।
বিএনপি প্রথমে আলাদা নির্বাচনের দাবি করলেও পরে শর্তসাপেক্ষে একসঙ্গে ভোটে সম্মত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও তাদের ভোটারদের অবস্থানও অনিশ্চিত। ফলে সরকারকে জামায়াত ও এনসিপির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ঐক্যের ভাঙন ও নতুন জোট
বর্তমানে জাতীয় ঐক্য অনেকটাই ভেঙে গেছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীরা সবাই আলাদা অবস্থানে। ফলে নতুন করে জোট ও সমঝোতার রাজনীতি শুরু হয়েছে। এই পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত নির্বাচন।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন জরুরি একটি সুস্পষ্ট কর্মসূচি প্রণয়ন করা—যার কেন্দ্রবিন্দু হবে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য নিরসন। অতীতে যেমন যুক্তফ্রন্ট বা ইস্যুভিত্তিক জোটের মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তেমনি আজও প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
গণ-অভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষার জন্য হতাশ না হয়ে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ রাজনীতিতে নামাই এখন সময়ের দাবি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে—৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ইতিহাসে একটি ব্যর্থ স্বপ্ন হবে, নাকি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সূচনা।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


