
রাবি শিক্ষকদের নিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড প্রতারণার প্যাকেজ, লক্ষ্মীপুরে নাহিদ ইসলাম
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) রোগীর সংখ্যা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও ফুসফুসজনিত জটিলতা নিয়ে রোগীর চাপ বেড়েছে।
বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) রোগীর সংখ্যা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও ফুসফুসজনিত জটিলতা নিয়ে রোগীর চাপ বেড়েছে। এর বড় একটি অংশ সিওপিডি আক্রান্ত। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিওপিডি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ পরিবেশদূষণ, বিশেষ করে বায়ুদূষণ। তারা বলছেন, নগরায়ন, শিল্পায়ন, যানবাহনের ধোঁয়া এবং নির্মাণকাজ থেকে নির্গত ক্ষতিকর কণার মাত্রা বাড়তে থাকায় ঝুঁকির মুখে পড়ছে নগর ও শিল্পাঞ্চলের মানুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে শ্বাস নেয়ার ফলে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে মারাত্মক রূপ নিচ্ছে। শুধু বায়ুদূষণই নয়, রান্নার সময় কঠিন জ্বালানি ব্যবহার, ধূমপান ও কর্মক্ষেত্রে ধুলাবালির সংস্পর্শও সিওপিডির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে এখনো কাঠ, খড় ও গোবর দিয়ে রান্না করার প্রবণতা থাকায় নারী ও শিশুরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্প-কারখানায় কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের ধোঁয়া কমানো এবং অবকাঠামো নির্মাণজনিত ধুলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো ও প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. এ কে এম ফাহমিদ নোমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিওপিডি হলো ফুসফুসের একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা শ্বাসনালিতে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসকে বাধা দেয়, যার প্রধান লক্ষণগুলো হলো শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি (কফসহ), বুকে চাপ এবং বাঁশির মতো শব্দ। রোগের মৃত্যুর কারণ হিসেবে সিওপিডি তিন নম্বরে অবস্থান করছে। এর মূল কারণ হলো বায়ুদূষণ। এছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপান, ফুসফুসে ইনফেকশনের কারণেও সিওপিডি দিন দিন বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও এ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর এ রোগ দেখা দেয়। সিওপিডি কখনো ভালো হয় না। এজন্য এটিকে প্রতিরোধ করাই শ্রেয়। কিন্তু রোগীর শারীরিক অবস্থা যেন পুরোপুরি খারাপ না হয় এজন্য আমরা চিকিৎসা করে থাকি। তার যে উপসর্গগুলো আছে সেগুলোর মাত্রা কমানো। যেমন শ্বাসকষ্ট, কাশি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা ওষুধের পাশাপাশি ভ্যাকসিন এবং ফুসফুসের ব্যায়াম করারও পরামর্শ দিয়ে থাকি। তবে প্রতিরোধের জন্য আমাদের জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়া আর্লি ডায়াগনোসিসের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে রোগীর শারীরিক কষ্ট অনেকাংশেই কমানো যায়।’
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালে শ্বাসতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালটির বিগত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরে সিওপিডি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। দুটি হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে চিকিৎসা নিতে আসা সিওপিডিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫৬, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ১২০-এ, ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৩১৭, ২০২৪ সালে ৫ হাজার ৬৮৮ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ৯২০।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বায়ুদূষণের কারণে সারা বিশ্বেই আসলে সিওপিডি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া অন্যান্য অনেক ফ্যাক্টরও রয়েছে। বায়ুদূষণ, নগরায়ন, গাছপালা কেটে ফেলা, প্রত্যক্ষ ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান, গাড়ির কালো ধোঁয়া ইত্যাদি নানা কারণে এ ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ১৮ কোটি মানুষের বসবাসযোগ্য যে পরিবেশ দরকার আমাদের সেটি নেই। আর এগুলোর প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যের ওপর। মানুষের শরীরের অন্যতম অংশ হলো ফুসফুস। ফুসফুস আক্রান্ত হলে শরীরের অন্যান্য অংশও ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। এজন্য সিওপিডি নিয়ে জনসচেতনতা অনেক বেশি পরিমাণে দরকার।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিওপিডি বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান কারণ। বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগছে। ২০২১ সালে পুরো বিশ্বে ৩৫ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ৫ শতাংশ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ ধরনের রোগী বেশি। বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই হয়ে থাকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। মোট আক্রান্তের ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী বায়ুদূষণ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ ধূমপান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে গড় আক্রান্তের হার ১১ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা বেশি।
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মোহাম্মেদ আবদুল্লাহ আল মেহেদি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সিওপিডি বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ অবশ্যই বায়ুদূষণ। তবে এ রোগ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবও রয়েছে। যার কারণে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ শনাক্তের বাইরে। অন্যান্য অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে যেভাবে সচেতনতা চালানো হয়, এ রোগ নিয়ে তা হয় না। সাবধানতা অবলম্বন করলেও এ রোগের জটিলতা কমানো সম্ভব। পরিবেশদূষণ কমানোর দিকে জোর দেয়ার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়ানোও অনেক জরুরি।’


