প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
অন্তর্বর্তী সরকারের ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের ৪২ শতাংশই চট্টগ্রামে
জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
অন্তর্বর্তী সরকারের ২ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্পের ৪২ শতাংশই চট্টগ্রামে
জানুয়ারি ২৮, ২০২৬

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে নৈরাজ্য চলছেই

দেশে একটি বড় গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও বাস্তব চিত্রে তার কাঙ্ক্ষিত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মবতন্ত্রের উত্থান, পত্রিকা অফিস ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে হামলা এবং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় বিবেচনায় অবৈধ নিয়োগ—সব মিলিয়ে জনমনে গভীর হতাশা সৃষ্টি হচ্ছে। যেই উদ্দেশ্যে মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই আদর্শ কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে তা নিয়ে সচেতন নাগরিকরা প্রশ্ন তুলছেন।

বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ কার্যক্রমে অনিয়ম ও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসব অনিয়ম বন্ধ হওয়ার বদলে বরং আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নিয়োগ কার্যক্রম তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

পত্রিকার তথ্যমতে, গত ১৫ মাসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান উপাচার্য ৪০৩ জন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিতর্কিত সাবেক উপাচার্য ইফতেখারের আমলে চার বছরে নিয়োগ পেয়েছিলেন ৪৯৯ জন। সময়ের অনুপাতে বর্তমান উপাচার্যের নিয়োগ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—এত স্বল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক নিয়োগ কি আদৌ প্রয়োজনীয় ছিল, নাকি এটি দলীয় বিবেচনায় তড়িঘড়ি করে করা হয়েছে?

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এসব নিয়োগের অনেকগুলোই করা হয়েছে অস্থায়ী প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এবং যথাযথ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই। এমনকি উপাচার্যের নিকট আত্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও এসব নিয়োগের আওতায় এসেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রো-ভিসির পরিবারের সদস্য শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার ঘটনাও সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া নিয়োগ বৈধ নয়—এ কথা সবার জানা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইউজিসি শুধু অনুমোদনের আনুষ্ঠানিকতা পালন করছে, কার্যকর নজরদারি বা তদন্তের ভূমিকা নিচ্ছে না। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, ইউজিসি যদি স্বাধীন ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করত, তাহলে এ ধরনের অনিয়ম এত সহজে ঘটত না।

সরকার পরিবর্তনের পর প্রত্যাশা ছিল, বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে নিয়োগে জড়িত বিতর্কিত উপাচার্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন হতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেই পথে না গিয়ে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দলীয়করণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে আগের অনিয়মের সংস্কৃতি বন্ধ না হয়ে বরং নতুন রূপে টিকে আছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের জন্য কোনো স্বচ্ছ ও একীভূত নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেনি। অথচ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে খ্যাতিমান শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা রয়েছেন। তাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়া হতাশাজনক।

এই পরিস্থিতিতে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ছাত্র সংগঠন দলীয় বিবেচনায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করছে কিংবা শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করছে। আবার নিজ দলের শিক্ষক ও প্রশাসনের অনিয়মে তারা নীরব সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব ছিল নতুন ব্যবস্থায় যোগ্যতার পক্ষে দাঁড়ানো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফল ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের ওপরই পড়বে। অযোগ্য শিক্ষক দ্বারা শিক্ষিত হয়ে নতুন প্রজন্মের দক্ষতা ও মান কমে যাবে, যা দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য হুমকি।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও অবৈধ নিয়োগ মারাত্মক ক্ষতির কারণ। অপ্রয়োজনীয় ও অযোগ্য জনবল নিয়োগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এই অর্থ যদি গবেষণা উন্নয়ন, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, হলের খাবারের মান উন্নয়ন বা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করা যেত, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার মান অনেক বাড়ত।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বর্তমান অরাজনৈতিক সরকারের আমলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিরপেক্ষ রাখা যাচ্ছে না। অতীতের অরাজনৈতিক সরকারগুলোর শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন মাত্রার দলবাজি ও মবতন্ত্রের অভিযোগ তেমন শোনা যায়নি। অথচ এখন সরকারি ক্রয় কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ পর্যন্ত সর্বত্র প্রশ্ন উঠছে, যা সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, মানুষ শুধু পদ-পদবি বা খ্যাতির মাধ্যমে বড় হয় না; নৈতিকতা, বিবেকবোধ এবং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমেই প্রকৃত বড় হওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান ও নৈতিকতার চর্চাকেন্দ্র। সেখানে যদি দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তবে সমাজের জন্য ইতিবাচক নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়।

এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন। প্রথমত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের জন্য একটি জাতীয় ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইউজিসিকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করে তুলতে হবে যাতে তারা প্রকৃত তদারকি করতে পারে। তৃতীয়ত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল আবেদন ও স্বয়ংক্রিয় স্কোরিং পদ্ধতি চালু করে মানবিক হস্তক্ষেপ কমাতে হবে। চতুর্থত, অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল দলীয়করণ ও দুর্নীতির অবসান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগে যে নৈরাজ্য চলছে, তা সেই চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শিক্ষা ব্যবস্থা যদি দলীয় নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিকতা ও দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হবে।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *