
এশিয়ার স্পট মার্কেটে নয় সপ্তাহের সর্বোচ্চে এলএনজির দাম
জানুয়ারি ২৬, ২০২৬
লাখো নিদর্শনের মধ্যে প্রদর্শন হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার, প্রতিষ্ঠার ১১২ বছরেও আধুনিকায়ন হয়নি জাতীয় জাদুঘরের
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমস প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি ও রফতানির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা, ভোক্তা সুরক্ষা এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা বজায় রাখতে কাস্টমস কার্যক্রম অপরিহার্য। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মোট রাজস্ব আদায়ের প্রায় ২৭ শতাংশ এসেছে কাস্টমস খাত থেকে। ফলে কাস্টমস ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
তবে বাস্তবতা হলো, দেশের কাস্টমস ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। শুল্কায়নের সেকেলে পদ্ধতি, অতিরিক্ত মানবনির্ভরতা, দীর্ঘসূত্রতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা প্রায়ই ভোগান্তির শিকার হন। একই ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত, চালান আটকে রেখে হয়রানি এবং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের ওপর জোর দিয়ে আসছেন।
বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিসর দ্রুত বাড়ছে এবং বাংলাদেশের আমদানি-রফতানিও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কাস্টমসের ওপর চাপও বাড়ছে। যদি কাস্টমস ব্যবস্থাপনা আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর না হয়, তাহলে এই বাড়তি চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এতে একদিকে রাজস্ব আদায় কমে যেতে পারে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের সময় ও অর্থের অপচয় হবে। পাশাপাশি শুল্ক ফাঁকি, আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকিও বেড়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের বড় একটি অংশ বাণিজ্যের মাধ্যমে ঘটে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, পাচার হওয়া অর্থের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাণিজ্যভিত্তিক পাচার। পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করে কম বা বেশি দেখানো, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করা এবং অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিয়ে এই অর্থ পাচার সংঘটিত হয়। ফলে কাস্টমস ব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, এটি আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউসিও) সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি কাস্টমস দিবস পালন করে। এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য কাস্টমস ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা। আধুনিক রাষ্ট্রে কাস্টমস শুধু রাজস্ব আহরণকারী সংস্থা নয়; এটি এক ধরনের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেও কাজ করে। সীমান্ত দিয়ে কী প্রবেশ করছে এবং কী বের হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কাস্টমস ভোক্তা সুরক্ষা, শিল্প রক্ষা, মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। তাই কাস্টমসের কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ কাস্টমসে অটোমেশনের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড চালু করা হয়েছে, অনলাইনে শুল্ক পরিশোধের ব্যবস্থা হয়েছে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা মডিউল চালু হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে বাস্তব প্রয়োগে এখনো মানবনির্ভরতা রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ব্যক্তির ওপর, প্রযুক্তিনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর নয়। ফলে দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
কাস্টমসের ডিজিটালাইজেশন বলতে শুধু অনলাইনে বিল এন্ট্রি করা বোঝায় না। এর অর্থ হলো পুরো প্রক্রিয়াকে তথ্যভিত্তিক ও ঝুঁকিনির্ভর করা। উন্নত দেশগুলোতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ চালান শনাক্ত করে। এতে অধিকাংশ বৈধ চালান দ্রুত ছাড় পায় এবং সন্দেহজনক চালানের ওপর বিশেষ নজরদারি করা যায়। এর ফলে ব্যবসায়ীদের সময় বাঁচে এবং অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধ করা সহজ হয়।
অটোমেশন মানেই কর্মকর্তাদের ভূমিকা কমে যাওয়া নয়; বরং তাদের কাজ হবে আরো বিশ্লেষণধর্মী ও দায়িত্বশীল। এজন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নৈতিকতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ জনবল ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো চালান কতদিন আটকে থাকবে বা কীভাবে মূল্যায়ন হবে, তা ব্যক্তিভেদে পরিবর্তিত না হয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাস্টমস সংস্কার কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি একটি কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ। যদি কাস্টমস দুর্বল থাকে, তাহলে অসাধু ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা সুযোগ নেয়। এর ফলে রাজস্ব কমে, সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজার ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি শিল্পায়নের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।
অতএব কাস্টমস ব্যবস্থাপনার অটোমেশন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারক, প্রশাসন ও ব্যবসায়ী—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারের উচিত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও নিয়ম মেনে চলার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, কাস্টমস ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা ছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্যের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। অর্থ পাচার রোধ, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে অটোমেশন ও স্বচ্ছতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি শুধু কাস্টমসের স্বার্থ নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


