
শেষ বলের জয়ে শীর্ষস্থান ধরে রাখল চট্টগ্রাম রয়্যালস
জানুয়ারি ১০, ২০২৬
প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিলের শুনানি শুরু
জানুয়ারি ১০, ২০২৬শুধু মবকে দোষারোপ করা মানে ব্যবস্থাকে দায়মুক্ত করা। এ ধরনের সহিংসতার ঘটনায় আমাদের পরিচিত উদারপন্থী প্রতিক্রিয়া প্রায় একই রকম—আইন-শৃঙ্খলা জোরদার, নাগরিক শিক্ষা, নৈতিক সংযমের আহ্বান। এসব প্রস্তাব সহিংসতাকে একটি আচরণগত বিচ্যুতি হিসেবে দেখে; কিন্তু এটি যে একটি কাঠামোগত বাস্তবতার ফল—সে সত্যটি আড়ালই থেকে যায়। ফলে সমস্যার উপসর্গ নিয়ে কথা হয়, কিন্তু মূল রোগটি অচিহ্নিত থেকে যায়।
মব সহিংসতাকে প্রায়ই হঠাৎ ঘটে যাওয়া, আবেগপ্রসূত ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই বর্ণনা সুবিধাজনক। এতে সহিংস জনতাকে উন্মত্ততার আকস্মিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখানো যায়, আর রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নের বাইরে রাখা যায়। অথচ বাস্তবতা হলো—মব কোথাও থেকে হঠাৎ জন্ম নেয় না। এটি তৈরি হয় দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, ক্ষোভ, বঞ্চনা এবং সামাজিক অবমূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। মব সহিংসতা আসলে কাঠামোগত সহিংসতার দৃশ্যমান ও নাটকীয় রূপ।
যখন মব সহিংসতাকে শুধুই আইনহীনতা বলা হয়, তখন একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। মনে হয়, সহিংসতা যেন কেবল শৃঙ্খলার অনুপস্থিতির ফল। কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়—এই সহিংসতার মধ্যেও একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা কাজ করে। কে টার্গেট হবে, কার ওপর আঘাত আসবে, কার জীবন সহজে বাতিলযোগ্য—এসব সিদ্ধান্ত মোটেও এলোমেলো নয়। এগুলো নির্ধারিত হয় অর্থনৈতিক অবস্থান, সামাজিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সুরক্ষার ভিত্তিতে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখানে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের সংকট, আয় বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতা মানুষের জীবনে স্থায়ী ভয়ের আবহ তৈরি করে। যখন মানুষ প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন ন্যায়বিচার, আইনের শাসন বা মানবাধিকারের মতো ধারণাগুলো ক্রমে বিমূর্ত হয়ে যায়। এই অনিশ্চয়তার ভেতর মানুষ ক্ষোভ জমায়—কিন্তু সেই ক্ষোভের প্রকৃত উৎস প্রায়শই অধরা থেকে যায়।
এখানেই আসে ‘সংগঠিত দারিদ্র্য’-র ধারণা। দারিদ্র্য কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিকল্পিতভাবে পুনরুৎপাদিত হয়। অনানুষ্ঠানিক শ্রমব্যবস্থা, চুক্তিহীন কাজ, সামাজিক সুরক্ষার অভাব—এসব মিলিয়ে এক ধরনের স্থায়ী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, যাদের জীবন সব সময়ই অনিশ্চিত। এই জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু রাজনৈতিক বা সামাজিক উত্তেজনার সময়ে তারা সহজেই ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।
মব সহিংসতায় অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ এই সংগঠিত দারিদ্র্যের বাস্তবতায় বাস করে। তাদের কাছে আইন প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের প্রতীক নয়; বরং দূরবর্তী ও পক্ষপাতদুষ্ট একটি কাঠামো। ফলে যখন সহিংসতা ঘটে, তখন তা কেবল অপরাধ নয়—অনেকের কাছে এটি ক্ষমতা প্রকাশের একমাত্র উপলব্ধ পথ। যে সমাজ নিয়মিতভাবে মানুষকে অপমানিত ও অবমূল্যায়িত করে, সেই সমাজ থেকেই মব তৈরি হয়।
এ ধরনের সহিংসতা অনেক সময় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা নীরবে অনুমোদিত বা প্রত্যক্ষভাবে উসকানি দেওয়া হয়। কারণ মব রাষ্ট্রের জন্য একটি সুবিধাজনক হাতিয়ারও হতে পারে। এতে দায় ব্যক্তির ওপর চাপানো যায়, কাঠামো অক্ষত থাকে। মব শাস্তি পায়, কিন্তু যে ব্যবস্থা তাদের তৈরি করেছে—তা প্রশ্নের বাইরে থেকে যায়।
অতএব, মব সহিংসতার সমাধান শুধু কঠোর আইন প্রয়োগে সম্ভব নয়। বরং প্রয়োজন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কাজের মর্যাদা ফিরিয়ে আনা, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং নাগরিকদের রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ন্যায্য সম্পর্ক গড়ে তোলা। যতদিন মানুষ নিজেকে বাতিলযোগ্য মনে করবে, ততদিন সহিংসতা কোনো না কোনো রূপে ফিরে আসবে।
মব সহিংসতা আমাদের বলে দেয়—সমাজের কোথায় ফাটল, কোথায় ক্ষোভ জমেছে। এটি কেবল শৃঙ্খলার অভাব নয়; এটি একটি অন্যায্য শৃঙ্খলার প্রকাশ। সেই শৃঙ্খলাকে প্রশ্ন না করে শুধু মবকে দোষারোপ করলে, সহিংসতা থামবে না—বরং আরও গভীরে প্রোথিত হবে।
জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


