
পাচারের অর্থ পুনরুদ্ধারে দেশ-বিদেশে ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার সম্পদ সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ
ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫
নির্বাচনে প্রার্থীদের অস্ত্র বহনের বিষয়ে প্রয়োজনে আচরণবিধি সংশোধন করা হবে —ইসি সচিব
ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫চট্টগ্রামে ক্রমেই বাড়ছে জলাতঙ্ক আক্রান্তের হার। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে ৬ হাজার ৭০৯ জন জলাতঙ্ক আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন, ২০২৪ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৩ হাজার ৯৯৩ জনে। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো না মিললেও নভেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজারের কাছাকাছি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কুকুরের পাশাপাশি বিড়ালের মাধ্যমে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরো উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধযোগ্য হলেও প্রাণঘাতী। যেখানে অধিকাংশ মৃত্যুর পেছনে কাজ করে অবহেলা, সময়মতো চিকিৎসা না নেয়া ও গ্রামীণ বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর নির্ভরতা। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীর কামড় বা আঁচড়কে গুরুত্ব না দিয়ে মানুষ হাসপাতালে যেতে দেরি করে কিংবা ঝাড়ফুঁক ও স্থানীয় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। ফলে সময়ক্ষেপণ হয়। কুকুর ছাড়াও বিভিন্ন পোষা প্রাণীর মাধ্যমে এ ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং উপসর্গ দেখা দিলে তখন চিকিৎসা নিয়েও কোনো লাভ হয় না। তাই কামড়ের পর পরই ক্ষত ভালোভাবে পরিষ্কার করা ও দ্রুত ভ্যাকসিন গ্রহণ জরুরি।
চট্টগ্রাম ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে জলাতঙ্ক আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছে ৬ হাজার ৭০৯ জন। পরের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮ হাজারে। ২০২৩ সালে চিকিৎসা নিয়েছে ১৪ হাজার ৩৩০ জন এবং ২০২৪ সালে প্রায় ২৪ হাজার নারী, পুরুষ ও শিশু জলাতঙ্ক আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছে। চলতি বছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব না পাওয়া গেলেও নভেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ২৬ হাজারের কাছাকাছি বলে জানিয়েছে হাসপাতালসংশ্লিষ্টরা।
গত চার বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২১ সালে কুকুরে কামড়ানো রোগী চিকিৎসা নিয়েছে ৪ হাজার ১৬০ জন এবং বিড়াল দ্বারা সংক্রমিত হয়ে ১ হাজার ৯৯৮ জন চিকিৎসা নিয়েছে। বাকিরা অন্যান্য প্রাণীর দ্বারা সংক্রমিত হয়। এর মধ্যে পুরুষ ৪ হাজার ৫৯৮ জন এবং নারী ২ হাজার ১১১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে রয়েছে ১ হাজার ৮০৪ জন। ওই বছর গভীর ক্ষত হওয়া রোগীদের র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) ভ্যাকসিন নিয়েছে ৪ হাজার ১৭০ জন। ২০২২ সালে সংক্রমিত আট হাজার জনের মধ্যে কুকুর দ্বারা সংক্রমিত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৪ হাজার ৭৪০ জন এবং বাকিরা বিড়াল বা অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে। ওই বছর আরআইজি ভ্যাকসিন দেয়া হয় আট হাজারের বেশি মানুষকে।
এদিকে ২০২৩ সালে কুকুর দ্বারা সংক্রমিত হয়ে ৬ হাজার ৪৯৯ জন এবং বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর দ্বারা সংক্রমিত হয়ে আরো ৭ হাজার ৮৩১ জন জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়। ২০২৪ সালে ২৩ হাজার ৯৮৩ জন জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে ভ্যাকসিন নিয়েছে। এর মধ্যে কুকুর দ্বারা সংক্রমিত ৭ হাজার ২০১ জন, বিড়ালের মাধ্যমে সংক্রমিত ১৬ হাজার ৬৩২ জন এবং অন্যান্য প্রাণীর দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে ১৫০ জন রোগী। ওই বছর সামান্য ক্ষত হওয়া রোগীদের মধ্যে অ্যান্টি র্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি) দেয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৫৫ জনকে এবং আরআইজি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে তিন দফায় ৫৯ হাজার ৫৯৬ ডোজ। সর্বশেষ ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২৬ হাজার রোগী জলাতঙ্কে সংক্রমিত হয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। যার মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি বিড়ালের মাধ্যমে সংক্রমিত।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা চাঁদগাঁও এলাকার বাসিন্দা শামীম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার বাসায় বিড়াল আছে। বিড়ালের আঁচড়ে কিছুটা ক্ষত হয়েছে। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন নিতে এসেছি। হাসপাতালে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন ও চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় বলে এখানে এসেছি। তবে অনেক সময় হাসপাতালে ভ্যাকসিন থাকে না। এখন ভ্যাকসিন পেয়েছি।’
জলাতঙ্কে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়া প্রসঙ্গে চিকিৎসকরা বলছেন, চট্টগ্রামে জলাতঙ্ক আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারিভাবে অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। মূলত শহরের বাসাবাড়িতে শখের বশে কুকুর ও বিড়াল পোষার কারণে মানুষ বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। বিভিন্ন সময় জলাতঙ্কে আক্রান্তদের মৃত্যু ও তাদের র্যাবিসে আক্রান্ত হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ স্বাভাবিক আঁচড়ের শিকার হলেও দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ছুটে আসছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় এ রোগের ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত না থাকায় বাইরে থেকেও অনেকে ভ্যাকসিন কিনে ব্যবহার করছে। সরকারি হিসাবের বাইরে আক্রান্তদের হার ক্রমে বাড়ছে। এজন্য পোষা প্রাণীদের সাবধানে লালন-পালনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর জলাতঙ্ক রোগের সংক্রমণ বেড়েছে। কয়েক বছর আগেও সংক্রমণের হার অনেক কম ছিল। কিন্তু এখন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। চট্টগ্রামের বাসাবাড়িতে পোষা প্রাণী, বিশেষ করে কুকুর ও বিড়াল পালনের কারণে সংক্রমণ বেড়েছে। প্রতি মাসে আমাদের হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে। তবে রোগীর চাপ এত বেশি যে ভ্যাকসিনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা মাস শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’


