
গাকৃবিতে টেকসই কৃষি পুনরুদ্ধার বিষয়ে সেমিনার
ডিসেম্বর ৯, ২০২৫
২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘের সহায়তা আবেদন শুরু, বিশ্বজুড়ে ‘উদাসীনতা’ নিয়ে ক্ষোভ
ডিসেম্বর ৯, ২০২৫ভোটাধিকার মানে কেবল পাঁচ বছরে একদিন লাইনে দাঁড়ানো নয়, বরং প্রতিটি ধাপে জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ প্রত্যাশা বারবার ব্যাহত হয়েছে। ভোটে নির্বাচিত নেতারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণে ঝুঁকেছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসদ প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধনী শ্রেণীর দখলে গেছে। বিরোধী দলগুলো সংসদকে কার্যকর করার পরিবর্তে অনুপস্থিত থেকেছে, আর নাগরিকরা দলীয় প্রতীকনির্ভর রাজনীতির কারণে নিজেরাই বহু সময় প্রার্থীর সততা বা সক্ষমতার প্রশ্নকে পাশে সরিয়ে রেখেছেন। এসব কর্মকাণ্ডে অনেক সময় সম্মতি উৎপাদন করেছেন দেশের সুশীল সমাজ। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়ার পেছনে অনেকাংশে এ বুদ্ধিজীবীরাই দায়ী। নাগরিক হিসেবেও এখন আমাদের সময় এসেছে আত্মবিশ্লেষণ করার।
রাজধানীতে গতকাল রাষ্ট্রায়ত্ত গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক সম্মেলনের শেষ অধিবেশনে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ পর্যটন ভবনে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলনে বরেণ্য গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় প্রতিপাদ্য শিরোনামে। এতে প্যানেল আলোচক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান, বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুর্শিদ, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সুলতান হাফিজ রহমান। অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক।
প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমরা বারবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হই। বাংলাদেশ সবসময়ই গণতন্ত্রের পথে এগোনোর কথা বলে এসেছে, কিন্তু প্রায়ই আমরা হতাশ হয়েছি। আমরা নেতাদের নির্বাচন করি, কিন্তু তাদের অনেকেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃত্ববাদী আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই হতাশা জমতেই থাকে। নির্বাচন ব্যবস্থাকে আমরা গণতান্ত্রিক বলি, কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই জবাবদিহি কার্যত উধাও হয়ে যায়। প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি না থাকলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নীতি ও চর্চা কোনোভাবেই টিকে থাকতে পারে না। শুধু পাঁচ বছরে একদিন ভোট দিয়ে প্রকৃত গণতন্ত্র বজায় রাখা যায় না। যদিও সে ভোটও অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, ‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পিছিয়ে পড়ার পেছনে আমাদের দেশে অনেকাংশে সুশীল সমাজ বা বুদ্ধিজীবীরাই দায়ী। প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে নৈতিক অবক্ষয়ও গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণে ভূমিকা রেখেছে।’
প্যানেল আলোচনায় রেহমান সোবহান বলেন, ‘এখন যে বড় সংস্কার কাঠামো নিয়ে জাতীয় আলোচনায় রয়েছে, সেগুলোর উৎসও এই যে দীর্ঘদিন আমাদের কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল না। বর্তমান সরকার হয়তো কিছু সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের ওপর। এখানেই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। ১৮ মাসের একটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই যে সংস্কার প্যাকেজ তৈরি হলো, তা হস্তান্তর করা হবে নির্বাচিত সরকারের কাছে। আশা করি, এ সংস্কারগুলো নতুন সরকারকে আলোকিত করবে। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় গেলে কী করে? তাদের স্বভাব, স্বার্থ, প্রণোদনা কী?’
এ প্রবীণ অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘গত ৫০ বছরে আমরা কখনো শান্তিপূর্ণভাবে কোনো সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারিনি। প্রতিটি সরকারই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছে। সংসদও সে অর্থে কার্যকর ছিল না। শক্তিশালী বিরোধী দল পাঁচ বছর ধরে সরকারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করেছে—এমন উদাহরণ নেই। বাজেট, দুর্নীতি, নীতিগত ব্যর্থতা, কাঠামোগত সংকট, এমনকি দীর্ঘদিন।’
বর্তমানে সংসদ সম্পূর্ণ ধনিক শ্রেণীর দখলে চলে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। রেহমান সোবহান বলেন, ‘১৯৭০ সালে যারা নির্বাচন করেছেন তাদের অনেকেই বাস ও রিকশায় চড়ে এলাকায় যেতেন। তাদের সম্পদ সীমিত ছিল। আজ কেউ নির্বাচন করার কথা কল্পনাও করতে পারেন না নিজের পাজেরো ছাড়া। আর ভোটে জিতলে তারা আরো একটি শুল্কমুক্ত পাজেরো পাবেন, এটাই সুবিধা। এভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার সামাজিক চরিত্রই পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন নির্বাচনে দাঁড়াতে হলে বিপুল অর্থ লাগে।’
আলোচনায় বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুর্শিদ বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গণতন্ত্রের স্তর আলাদা। পশ্চিম ইউরোপ আর উত্তর আমেরিকা দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক অঞ্চল, যদিও সেখানে বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার গণতান্ত্রিকভাবে পিছিয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবু ওই অঞ্চলগুলো এখনো গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী উদাহরণ। দক্ষিণে চিত্রটা মিশ্র। পূর্ব এশিয়াকে সাধারণভাবে কর্তৃত্ববাদী বলা হয়, কিন্তু সেখানেও গণতান্ত্রিক চর্চার ছোট ছোট দ্বীপ আছে। পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা সিঙ্গাপুরকে কর্তৃত্ববাদী মনে করেন, কিন্তু সিঙ্গাপুরের নিজস্ব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাদের অগ্রগতি একেবারে খারাপ নয়। তাই বৈশ্বিক ফলাফল মিশ্রই। এ বৈশ্বিক চিত্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক?’


