ঝিনাইদহে পরিবার কল্যাণ সেবা সপ্তাহ উদ্বোধন
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
বরিশালে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষ হলেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
ঝিনাইদহে পরিবার কল্যাণ সেবা সপ্তাহ উদ্বোধন
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
বরিশালে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষ হলেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব
ডিসেম্বর ৭, ২০২৫

তিন দশকেও হয়নি বাসযোগ্য আরো ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিচ্ছে রাজউক

রাজধানী ঢাকার পাশে ‘আধুনিক ও পরিকল্পিত নগরী’ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৫ সালে শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প। তবে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে বসবাস উপযোগী হয়নি। প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সড়ক ব্যবস্থা। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা না থাকায় পূর্বাচলে বসতি স্থাপন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন জমির মালিকরা।

অঞ্চলটিকে পুরোপুরি বসবাসযোগ্য করে তোলার কথা বলে নতুন করে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এ বিষয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, ভুল ব্যক্তিদের বরাদ্দ দেয়ার নীতি থেকে বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত পূর্বাচল বসবাস উপযোগী হওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই।

তিন দশক আগে নেয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ছিল রাজধানীর মধ্যবিত্তের আবাসন সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ঢাকার চাপ কমানো। যদিও এরই মধ্যে সাড়ে তিন কোটি মানুষের শহর ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহরের তালিকায় উঠে এসেছে। অন্যদিকে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পকে আবাসন নয়, জমির সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে তৈরি করেছে রাজউক। বরাদ্দকৃত জমি অনেকের জন্যই খুলে দিয়েছে রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার পথ। এর পেছনে রাজউকের প্লট বরাদ্দ নীতিতে ভুল ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দরিদ্র জনগণের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এমন মানুষদের, যাদের আবাসনের চাহিদা নেই। তাই যুগের পর যুগ প্লটগুলো খালি পড়ে আছে। ‌রাজউক তাদেরই বরাদ্দ দিয়েছে, যাদের বিকল্প আবাসন আছে। সরকারের সচিব, আমলা, রাজনীতিবিদদের প্লট আছে পূর্বাচলে। তারা তো এরই মধ্যে গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় বসবাস করছেন। দেশের বাইরেও তাদের আবাসন আছে। তাহলে কোন সুখে তারা পূর্বাচলে যাবে?’

তিনি আরো বলেন, ‘রাজউকের উচিত হবে যাদের বিকল্প আবাসন আছে অতিদ্রুত তাদের প্লট বরাদ্দ বাতিল করা। এটা করতে পারলে রাতারাতি পূর্বাচলে মানুষ বসবাস শুরু করবে। কিন্তু রাজউক সেটা করবে না। তারা ৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেবে আরো দুর্নীতি করার জন্য। এগুলো সম্পূর্ণরূপে জনগণের টাকার অপচয়।’

জানা গেছে, ‘পূর্বাচল অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) গত আগস্টে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায় রাজউক। নিজস্ব অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নগরীকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতেই এটি হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। যদিও ডিপিপিতে উল্লেখিত বিভিন্ন খাতের ব্যয়, ক্রয় পরিকল্পনা, নতুন করে ভূমি উন্নয়ন, অপ্রয়োজনীয় খাতে চাওয়া বরাদ্দ নিয়ে তোলা হয় প্রশ্ন। তাই সেটি ফেরত পাঠানো হয়েছে সংশোধনের জন্য।

প্রকল্পের নথি সূত্রে জানা যায়, পূর্বাচল উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৮ হাজার ৮৭০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ভূমি উন্নয়ন, সড়ক প্রশস্ত করা, ফুটপাত, মসজিদ, মন্দির, মার্কেট, খেলার মাঠসহ মোট ১২টি খাতে ব্যয়ের কথা বলা হয় ডিপিপিতে। তিন দশকেও ভূমি উন্নয়ন শেষ না হওয়ায় এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮৭ কোটি টাকা। ৩৩৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রায় ৩২১ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণে ৩২৩ কোটি, ১০টি স্লুইচগেট ও একটি বক্স কালভার্ট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬১ কোটি টাকা। ২০ হাজার ২১৩ দশমিক ৭ বর্গমিটারের আবাসিক বিল্ডিং নির্মাণে ১৪০ কোটি টাকা, ২৭৬টি মসজিদ ও তিনটি অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ৭৬৭ কোটি, আনসার ব্যারাক নির্মাণে ১৩ কোটি, ৩৬৩ কিলোমিটার স্ট্রিট লাইট স্থাপনে ৫৪৫ কোটি ও ১৯টি কাঁচাবাজার নির্মাণে ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবং প্রকল্প এলাকায় সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে রাজউক পূর্বাচল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে শেষ হবে ২০২৮-এর জুনে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, এটি নির্মাণ হলে চার হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখার সুযোগ পাবে। প্রকল্পটির সুবিধাভোগী হবে পূর্বাচলে বসবাসকারী ১৬ লাখ জনগোষ্ঠী। তবে স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের। তাই তৃতীয় পক্ষ দিয়ে নতুন করে ফিজিবিলিটি স্টাডি করতে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব কবির আহামদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পূর্বাচলকে বাসযোগ্য করে তুলতে অবকাঠামো নির্মাণ করতে চায় রাজউক। তারা সেখানে অবকাঠামোর পাশাপাশি স্কুল-কলেজও করবে। পূর্বাচল প্রকল্পটি করা হয়েছিল ঢাকার জনসংখ্যা স্থানান্তর করতে। কিন্তু সেখানে নাগরিক সুবিধা না থাকায় মানুষ আকৃষ্ট হয়নি। যেখানে মানুষের চলাচলের সুবিধা নেই, নিরাপত্তা নেই, বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ নেই, হাসপাতাল সুবিধা নেই, স্কুল-কলেজ নেই সেখানে কে যাবে? কয়েকটা পার্ক নিয়ে মানুষ বসবাস করবে নাকি? মানুষ প্লট কিনেছে, কিন্তু পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় ভবন নির্মাণ করছে না।’

আগের আর নতুন মিলিয়ে মোট ১৭ হাজার কোটি টাকায় রাজউক কার স্বার্থে পূর্বাচল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, সে প্রশ্ন তুলেছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, পূর্বাচল প্রকল্পটিকে আবাসন সমস্যার সমাধান না বানিয়ে দেশের জমির সবচেয়ে বড় বাজার বানিয়েছে রাজউক। এখানকার জমি অধিগ্রহণ করেছিল কাঠাপ্রতি সাড়ে ১৪ হাজার টাকারও কম মূল্যে। এরপর সে জমি বরাদ্দে গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছিল দেড় লাখ টাকা করে। প্রতিবার মালিকানা বদলের পর দাম বেড়েছে কয়েক গুণ করে। বর্তমানে পূর্বাচলে জমির কাঠাপ্রতি গড় দাম দাঁড়িয়েছে এক-দেড় কোটি টাকায়।

নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজউকের উচিত ছিল প্লট বিক্রি না করে ফ্ল্যাট বানিয়ে তা বিক্রি করা। তাহলে আবাসন সমস্যা সমাধানে এ প্রকল্প কিছুটা হলেও কাজে লাগত। কিন্তু রাজউক তা না করে প্লট বরাদ্দ দিচ্ছে। এখন এসব প্লটের ক্রেতারা পরিশ্রম ছাড়াই কোটিপতি বনে যাচ্ছেন। এটি সম্পূর্ণভাবে আইনের শাসন ও ন্যায্যতাবিরোধী কার্যক্রম। বিষয়টিকে এখন অনেকটা জুয়া খেলার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। কারণ লটারিতে ভাগ্যগুণে প্লট পেলেই কোটিপতি হওয়া যায়! রাজউকের কাজ মানুষকে জুয়ার পদ্ধতিতে ধনী করা নয়।’

প্লট মালিক ও কয়েকজন জমি কেনাবেচায় মধ্যস্থতাকারীর ভাষ্যমতে, পূর্বাচল নতুন শহরে আবাসন গড়ে না ওঠার বড় কারণ জমির উচ্চমূল্য। হাতবদল হলেই জমির দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। এমনকি এখানে সব ধরনের নাগরিক সুবিধাও যদি নিশ্চিত করা যায়, তার পরেও অদূরভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে না শুধু জমির উচ্চমূল্যের কারণে। বরং জমি কেনাবেচার মাধ্যমেই একটি শ্রেণী ক্রমাগত লাভবান হতে থাকবে।

নতুন প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি নেয়া হচ্ছে পূর্বাচল নতুন শহরের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য। প্রথম প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ওই অসমাপ্ত প্রকল্পের কিছু টাকা যোগ হবে। এখানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ হবে। অসম্পূর্ণ কাজগুলো সম্পূর্ণ করা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *