খালেদের প্রথম আঘাত, আয়ারল্যান্ডের স্কোর
নভেম্বর ২০, ২০২৫
যমুনা নামে নতুন উপজেলার দাবিতে সিরাজগঞ্জে মানববন্ধন
নভেম্বর ২১, ২০২৫
খালেদের প্রথম আঘাত, আয়ারল্যান্ডের স্কোর
নভেম্বর ২০, ২০২৫
যমুনা নামে নতুন উপজেলার দাবিতে সিরাজগঞ্জে মানববন্ধন
নভেম্বর ২১, ২০২৫

সুষ্ঠু নির্বাচন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—অর্থনীতির গতি ফেরানোর পূর্বশর্ত

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা একটি গভীর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতিতে অস্থিরতা কিছুটা কমলেও তা পুরোপুরি কাটেনি। সরকার পরিবর্তন, নতুন কাঠামো, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান—এসব মিলিয়ে দীর্ঘ ধোঁয়াশা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক উপায় হলো নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন। কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনীতির গতি ফেরানো সম্ভব নয়।

আগামী জাতীয় নির্বাচন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে—এ ঘোষণা অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমিয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখন গেম থিওরির ডমিনেন্ট স্ট্র্যাটেজি—অংশ না নিলে ঝরে পড়ার ঝুঁকি থাকে, আর অংশ নিলে অন্তত প্রতিযোগিতার মাঠে থাকা যায়। ফলে সম্ভাবনা প্রবল যে সব দলই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে, এবং এটাই অর্থনীতির জন্য বড় ইতিবাচক সংকেত।

তবে নির্বাচনই সব সমস্যার সমাধান নয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির গভীরতম সংকট। অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারগুলো শুরু করেছে—যেমন এনবিআর পুনর্গঠন, ব্যাংক একীভূতকরণ, রাজস্ব ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা—এসবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এসব সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। উদ্বেগের জায়গা হলো—ইতোমধ্যে কিছু রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে জানিয়েছে যে তারা নির্দিষ্ট কিছু সংস্কার এগিয়ে নেবে না। এর ফলে সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈর হয়েছে।

ব্যাংক খাতে একীভূতকরণের উদ্যোগকে সামনে রেখে নতুন ব্যাংক গঠনের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে অগ্রগতি খুবই কম। ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধনের যে নতুন কাঠামোর কথা বলা হয়েছে, তার টেকনিক্যাল প্রস্তুতিই এখনো অসম্পূর্ণ। নতুন সরকার এ উদ্যোগ এগিয়ে নেবে নাকি বিগত অবস্থায় ফিরিয়ে দেবে—তা এখনো পরিষ্কার নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার হয়তো কিছু ধারণা দেবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে—ইশতেহারে স্পষ্ট রোডম্যাপ দেওয়ার প্রবণতা কমই দেখা যায়।

অর্থনীতির আরেকটি বড় সংকট মূল্যস্ফীতি। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বারবার মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তা অর্জন কঠিন হয়ে উঠছে। ডলারের দাম কমানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করে বিনিময় হার কমতে দেয়নি। তাদের যুক্তি ছিল—রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু এতে আমদানি ব্যয় কমার যে সুযোগ ছিল, সেটিও নষ্ট হয়েছে। ফলে কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কমার সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এটি ছিল বড় ভুল নীতি।

এদিকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নগদ অর্থের চাহিদা বাড়ছে নির্বাচনী ব্যয়ের কারণে। এমন অবস্থায় যদি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি শিথিল করা হয় এবং নীতি সুদহার কমানো হয়, তবে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা, বাজারে কারসাজি ঠেকানো ও বড় সিন্ডিকেটগুলোকে নজরদারিতে আনা।

ঋণ বা বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কারণ কেবল উচ্চ নীতি সুদহার নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল সেবা কাঠামো এবং ব্যবসা ব্যয়ের বৃদ্ধি—এসবই বড় বাধা। প্রাতিষ্ঠানিক সেবার মান না বাড়লে কোনোভাবেই বিনিয়োগ বাড়বে না। নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যদি গঠনমূলক সংস্কার, স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় ভূমিকা নেয়, তখনই প্রকৃত অর্থে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

সর্বোপরি—একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন অর্থনীতির গতিশীলতা পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ। কিন্তু টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজন সুসংহত প্রতিষ্ঠান, ধারাবাহিক সংস্কার এবং বাজারে ন্যায়সংগত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের জন্য এখন এটাই সবচেয়ে জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *