
আধুনিক অর্থনীতির ভিত্তি তৈরিতে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা ব্যাপক অবদান রাখছেন: প্রধান উপদেষ্টা
নভেম্বর ৮, ২০২৫
অ্যান্ড্রয়েডে প্রথম দিনে সোরার ডাউনলোড প্রায় ৫ লাখ
নভেম্বর ৮, ২০২৫বাজেট ঘোষণার পর অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারের অর্থ ব্যয়ের গতি বেশ মন্থর থাকে। ব্যয় বৃদ্ধি শুরু হয় মূলত তৃতীয় প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) থেকে, সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় অর্থবছরের শেষ মাস জুনে।
বাজেট ঘোষণার পর অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারের অর্থ ব্যয়ের গতি বেশ মন্থর থাকে। ব্যয় বৃদ্ধি শুরু হয় মূলত তৃতীয় প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) থেকে, সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় অর্থবছরের শেষ মাস জুনে। তবে এবার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরুর দিকেই অন্যবারের তুলনায় সরকারের অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় এবার পরিচালন ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে ব্যয় ছাড়িয়েছে ১ লাখ কোটি টাকা, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। আর গত জুনে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে আড়াই লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে অন্তর্বতী সরকার।
অর্থ বিভাগ সম্প্রতি চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের বাজেট বাস্তবায়নসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, জুলাই-সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সরকার। এর মধ্যে পরিচালন খাতে ৯৪ হাজার ৩৯৯ কোটি ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৯৫ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে পরিচালন খাতে ৮৪ হাজার ৫৮৬ কোটি ও উন্নয়ন খাতে ১০ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা ব্যয় করে সরকার। এর আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৮৪ হাজার ৬২০ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮২ হাজার ৩০৭ কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে ৭২ হাজার ৫২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল।
উন্নয়ন খাতে ব্যয় কমলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের ব্যয় বেড়েছে মূলত পরিচালন খাতে। এক্ষেত্রে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ব্যয় বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। কৃষি মন্ত্রণালয় চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৭ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। ব্যয় বেড়েছে ৫ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে ইআরডির। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিভাগটি ৬ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। যেখানে এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। যেখানে এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় হয়েছিল ৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সার ও গম আমদানির কারণে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ব্যয় বেড়েছে। তবে সার্বিকভাবে তুলনা করলে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের ব্যয় কিছুটা বাড়লেও সামনে যে বড় ধরনের ব্যয়ের চাপ আসতে যাচ্ছে তার তুলনায় এটি তেমন কিছু না। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, সুদ পরিশোধ ও নির্বাচন বাবদ সরকারের ব্যয় অনেক বাড়বে। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে আমরা আগের মতোই অনেক বেশি ব্যয় করতে দেখেছি। এক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হলে এ ধরনের পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’
অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকের আগে সাধারণত সংশোধিত বাজেট প্রণয়ন করা হলেও এবার ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন থাকায় বাজেট সংশোধনের সময়সূচি এগিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সময়সীমা এগিয়ে আনার কারণেও এবার বাজেট বাস্তবায়নের গতি কিছুটা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের ব্যয় ভালোই বেড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিচালন খাতে ব্যয় না বাড়াটাই ভালো। খাতভিত্তিক ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য থাকলে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হতো কোন কারণে সরকারের ব্যয় বেড়েছে। তবে সাধারণভাবে ধারণা করা যায় সুদ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজেট সংশোধনের সময়সীমা এগিয়ে নিয়ে আসার কারণে অন্যবারের তুলনায় এবার ব্যয়ের গতি কিছুটা বেশি।’
আয়ের চেয়ে ব্যয় কম হওয়ার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের তহবিলে ১২ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। এ সময় রাজস্ব বাবদ ১ লাখ ১৭ হাজার ১১৭ কোটি টাকা আয় করেছে সরকার। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে করেছিল ১ লাখ ৩৩১ কোটি টাকা। তহবিলে উদ্বৃত্ত থাকার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকারের ঋণ বাবদ অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ১৩ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। এর মানে হচ্ছে এ সময়ে সরকার যে পরিমাণ ঋণ করেছে, পরিশোধ করেছে তার চেয়ে বেশি।
ঋণের সুদ পরিশোধে প্রতি বছরই সরকারের বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ খাতে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ঋণের সুদ বাবদ ৩১ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা স্থানীয় এবং ৬ হাজার ৮১ কোটি টাকা বিদেশী ঋণের সুদ। গত অর্থবছরের একই সময়ে সুদ বাবদ ৪১ হাজার ৩১৯ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল সরকার। এবার সুদ পরিশোধের পেছনে সরকারের ব্যয় কমার কারণ মূলত স্থানীয় ঋণের বিপরীতে গত অর্থবছরের তুলনায় কম পরিশোধ করতে হয়েছে। তবে গতবারের তুলনায় এবার বিদেশী ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
এদিকে বরাবরের মতোই সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বড় অংকের অর্থ ব্যয় করেছে সরকার। এ সময় পরিচালন ও উন্নয়ন খাত মিলিয়ে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা ব্যয় করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষ মাসে অবশ্য ব্যয় হয়েছিল আরো বেশি, ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তাছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুনে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৮০ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরের একই সময়ে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৬ কোটি এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের জুনে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল তৎকালীন সরকার।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগের চেয়ে সরকারের অর্থ ব্যয়ের হার বেড়েছে এটি কিছুটা ইতিবাচক। তবে আমরা চাইব এটি সব প্রান্তিকেই সমভাবে বাড়ুক। প্রথমদিকে ব্যয়ের গতি ধীর এবং শেষদিকে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত খরচ করার বিষয়টি বাজেটীয় শৃঙ্খলার দিক থেকেও কাম্য নয়। তাছাড়া এটি ব্যয় দক্ষতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
তিনি অবশ্য এও বলেন, ‘সরকারি ব্যয় বাড়লেও সেটি হয়েছে পরিচালন খাতে। এক্ষেত্রে কিন্তু উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়েনি। পরিচালন খাতের মধ্যে বেতন-ভাতা, ভর্তুকি, সুদ পরিশোধেই সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। অন্যদিকে উন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়লে সেটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতো। তাই উন্নয়ন খাতের ব্যয় কীভাবে বাড়ানো যায় সেটি আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।’


