চীনা কৌশলে দুর্বল হয়ে পড়ছে মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ
নভেম্বর ৫, ২০২৫
‘সমঝোতামূলক রূপরেখা’ তৈরিতে কমিটি করল জামায়াত
নভেম্বর ৫, ২০২৫
চীনা কৌশলে দুর্বল হয়ে পড়ছে মিয়ানমারে বিদ্রোহীদের সশস্ত্র প্রতিরোধ
নভেম্বর ৫, ২০২৫
‘সমঝোতামূলক রূপরেখা’ তৈরিতে কমিটি করল জামায়াত
নভেম্বর ৫, ২০২৫

হাতে হাতকড়া পড়া আমিনুল হক এবার এমপি প্রাথী।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি দেশের ২৩৭টি আসনে প্রাথমিক প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করেছে। সোমবার (৩ নভেম্বর) রাজধানীর গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তালিকা প্রকাশ করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সেই তালিকায় অন্যতম চমক হলো সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও দেশের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে খ্যাত আমিনুল হক। তাকে ঢাকা-১৬ (রূপনগর–পল্লবী) আসনের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে আমিনুল হকের নাম মানেই অনুপ্রেরণার আরেক নাম। এমন এক সময় তিনি দেশের হয়ে খেলেছেন, যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ ফুটবল ছিল সীমিত সাফল্যের অধিকারী। অথচ সেই সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকেও আমিনুল নিজের যোগ্যতা, সাহস আর পারফরম্যান্স দিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।
তিনি শুধু বাংলাদেশ নন, দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষকদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বারবার।

সাফল্যের উজ্জ্বল অধ্যায়

২০০৩ সালের সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ—বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। সেই টুর্নামেন্টের নায়ক ছিলেন আমিনুল হক। মালদ্বীপের বিপক্ষে ফাইনালে নির্ধারিত সময় শেষে খেলা ১-১ গোলে ড্র হলে ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে আমিনুলের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ ৫-৩ ব্যবধানে জয় পায় এবং প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরে।
সেই জয়ের মুহূর্ত আজও বয়ে বেড়ায় কোটি ভক্তের আবেগ। গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে অগণিত আক্রমণ প্রতিহত করেছিলেন তিনি—এ যেন দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক কিংবদন্তি মুহূর্ত।

এরপর ২০১০ সালের এসএ গেমসে ফুটবল ইভেন্টেও আমিনুলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আবারো গৌরব অর্জন করে। ফাইনালে ভারতকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে স্বর্ণপদক জেতে লাল-সবুজ দল। ১৯৯৯ সালের সাফ গেমসেও দলের হয়ে শিরোপা জয়ের সঙ্গী ছিলেন তিনি।
অর্থাৎ, গত দুই দশকে বাংলাদেশের ফুটবলে যত সাফল্য এসেছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিল আমিনুলের অবদান।

খেলা থেকে রাজনীতি: নতুন ইনিংসের শুরু

খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন গণমাধ্যমে ও ফুটবল সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে আমিনুল রাজনীতির ময়দানে নামেন। অনেক সাবেক তারকা যেখানে ক্ষমতাসীন দলের ছায়াতলে গিয়ে সুবিধাভোগী হয়েছেন, সেখানে তিনি বেছে নেন বিরোধী শিবির—বিএনপি।
তিনি বর্তমানে দলটির ক্রীড়া সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠে যেমন তিনি প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকাতে দৃঢ় ছিলেন, রাজনীতিতেও দেখিয়েছেন সেই সাহস ও দৃঢ়তা।

তবে এই পথে তার যাত্রা সহজ ছিল না। সরকারের সমালোচনামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ায় একাধিকবার হয়রানির শিকার হয়েছেন, এমনকি কারাবরণও করেছেন। যে হাতে দেশের পতাকা উড়েছিল বিজয়ের মুহূর্তে, সেই হাতেই একসময় উঠেছিল হাতকড়া।
রাজনীতির প্রতিকূল সময়েও তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন এবং আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

ফুটবলের বাইরের গল্প

আমিনুলের ফুটবল ক্যারিয়ার যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি রয়েছে কিছু অপূর্ণতাও। তিনি দেশের সেরা ক্লাবগুলোর—ঢাকা মোহামেডান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ও শেখ জামালের হয়ে খেলেছেন। ২০০৪ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেড তার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু যোগাযোগের সমস্যার কারণে চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।
যদি সেই সুযোগ বাস্তবে রূপ নিত, তাহলে হয়তো বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচিত হতো।

খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি শুধু গোলবারে নয়, মাঠের বাইরে শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করা, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা—এসব গুণেই তিনি ছিলেন কোচ ও ভক্তদের প্রিয় মুখ। এজন্যই অনেকের মতে, তিনি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, এশিয়ার যেকোনো দলে খেলার যোগ্যতা রাখতেন।

নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে আমিনুল

এবারের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া মানে আমিনুলের জীবনে আরেকটি নতুন চ্যালেঞ্জ। রাজনীতির মাঠে নামছেন একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড়, যিনি একসময় লাখো মানুষের ভালোবাসার প্রতীক ছিলেন। তবে রাজনীতির মাঠ ফুটবলের মাঠের চেয়ে ভিন্ন—এখানে প্রতিপক্ষ, কৌশল ও চ্যালেঞ্জ সবই আলাদা।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আমিনুল দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও তিনি রূপনগর–পল্লবী অঞ্চলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামলে তার উপস্থিতি বিএনপির প্রচারণায় নতুন উদ্দীপনা যোগ করবে বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

শেষ কথা

দেশকে ফুটবলে গৌরব এনে দেওয়া এই মানুষটি রাজনীতিতেও তেমনি সাফল্য দেখাতে পারেন কি না—এখন সেটিই সময়ের অপেক্ষা।
যে আমিনুল হকের হাত একসময় দেশের জার্সি পরে বিজয়ের আনন্দে উড়েছিল, সেই হাতই এবার ভোটের প্রতীক নিয়ে মাঠে নামবে জনগণের সমর্থন পেতে।
তিনি মাঠে যেমন নির্ভরযোগ্য গোলরক্ষক ছিলেন, এবার দেখা যাক—রাজনীতির ময়দানে তিনি কেমন নেতৃত্ব দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *