
বিএনপি আগামীতে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে
অক্টোবর ২৭, ২০২৫
মাহফুজ তার বক্তব্যে প্রমাণ করেছেন, তিনি ওই পদের যোগ্য নন : মাসুদ কামাল
অক্টোবর ২৭, ২০২৫রাজশাহীর পদ্মার চরে যখন সকালের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন ক্যামেরা হাতে এক তরুণ দম্পতিকে দেখা যায় ঘুরে বেড়াতে। কখনো পাখির ডাকের টানে, কখনো প্রজাপতির ডানার রঙে। তাঁরা ইমরুল কায়েস ও উম্মে খাদিজা। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে উদ্যমী প্রকৃতি আলোকচিত্রীদের মধ্যে দুইজন।
দেশজুড়ে ঘুরে বেড়িয়ে তাঁরা তুলেছেন চার শতাধিক পাখির ছবি, তিন শতাধিক প্রজাপতির প্রতিচ্ছবি, আর সম্প্রতি তাঁদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে এমন এক বিস্ময়, বিলুপ্ত ঘোষিত মিঠাপানির কুমির।
অক্টোবরের এক বিকেল। পদ্মাচরের কাশবনে লাল মুনিয়া পাখির ছবি তুলছিলেন কায়েস ও খাদিজা। ঠিক তখনই বন্য প্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবিরের ফোন। পদ্মায় নাকি দেখা গেছে কুমির!
ক্যামেরা আর ড্রোন হাতে ছুটে যান তাঁরা। পদ্মার বিস্তীর্ণ চরে ঘণ্টাখানেক খোঁজার পর অবশেষে কায়েসের ড্রোনে দেখা মেলে এক চলমান ছায়া। সত্যিই কুমির!
‘পাগলি, কুমির!’ বলে চিৎকার করে ওঠেন কায়েস। আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন খাদিজা। প্রকৃতিতে জীবন্ত কুমির দেখার সেই মুহূর্ত আজও তাঁদের জীবনের সেরা আবিষ্কার।
প্রকৃতি শুধু পাখি নয়, তাঁদের ডানা মেলিয়েছে প্রজাপতির জগতেও। বাংলাদেশের প্রায় ৪২০ প্রজাতির প্রজাপতির মধ্যে ৩০০ প্রজাতির ছবি তুলেছেন এই দম্পতি। এর মধ্যে চারটি প্রজাতি আগে কখনো দেশে তালিকাভুক্ত হয়নি। ওয়েভি ম্যাপলেট, ব্রাইট বাবল ব্লু, অটাম লিফ ও আনব্রোকেন সার্জেন্ট।
তাঁদের এই অর্জনে প্রজাপতিবিজ্ঞানীরাও মুগ্ধ। অধ্যাপক মনোয়ার হোসেনের ভাষায়, ‘তাঁরা শুধু ছবি তোলেননি, বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের দলিল রচনা করেছেন।’
প্রকৃতি কখনো ভালোবাসে, আবার ভয়ও দেখায়। সিলেটের মাধবকুণ্ডে ছবি তুলতে গিয়ে এক রাতে বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি, তীব্র বাতাসে ছাউনির নিচে ঘণ্টাখানেক কাটিয়েছিলেন তাঁরা।
খাদিজা বলেন, ‘ভয় ছিল, কিন্তু প্রকৃতিও যেন আমাদের সাহসের পুরস্কার দিল। এক ঘণ্টা পর আকাশ পরিষ্কার হয়ে উঠল, আর এক টুকরো চাঁদ উঠে এল। সেই আলোয় বুঝলাম, প্রকৃতি ভয় দেখায়, কিন্তু কখনো হারিয়ে দেয় না।’
ছোটবেলার কৌতূহল থেকেই কায়েসের প্রকৃতিপ্রেম। রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে পড়ার সময় উম্মে খাদিজার সঙ্গে পরিচয়। প্রাইভেট পড়তে গিয়ে বন্ধুত্ব, তারপর ছবির জগতে হাত ধরা।
২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ২০২২ সালে বিবাহ। এখন তাঁরা কেবল দম্পতি নন, একে অপরের সহযাত্রীও। পরিবারে আর বাধা নেই, আছে উৎসাহ।
এ বছরই দুজনের উচ্চশিক্ষা শেষ। কায়েস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগে স্নাতকোত্তর, আর খাদিজা ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিষয়ে এমবিএ।
২০১৯ সাল থেকে উত্তরাঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে কাজ করছেন। পাশাপাশি কাজ করছেন প্রকৃতি সংরক্ষণ সংগঠনের সঙ্গে। এখন স্বপ্ন, তাঁদের ভালো লাগার কাজটাকেই পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
ইমরুল কায়েস বলেন, ‘প্রতিটি ছবি শুধু একটি প্রাণীর নয়, আমাদের পৃথিবীর গল্প। আমরা চাই, মানুষ প্রকৃতিকে নতুন চোখে দেখুক। ভালোবাসুক।’
উম্মে খাদিজা যোগ করেন, ‘ক্যামেরা শুধু আমাদের পেশা নয়, এটা আমাদের প্রেম। প্রকৃতির প্রতি, জীবনের প্রতি।’
বাংলাদেশের প্রকৃতি আজও বেঁচে আছে তাঁদের মতো তরুণদের চোখে।
যেখানে একদিকে বিলুপ্তির শঙ্কা, সেখানে ইমরুল কায়েস ও উম্মে খাদিজা যেন আশার আলো। মনে করিয়ে দেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু দেখা নয়, তাকে রক্ষা করাও আমাদের ভালোবাসা।


