সন্দেহজনক হামে আরো ১১ মৃত্যু বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
১০৩ অনাপত্তি সনদ বাতিল ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
সন্দেহজনক হামে আরো ১১ মৃত্যু বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
১০৩ অনাপত্তি সনদ বাতিল ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বন্ধ
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

মাসের ব্যবধানে পোলট্রি ফিডের কাঁচামালের দাম বেড়েছে ১০-২৫% আরো চাপে প্রান্তিক খামারিরা

ফিড শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এক-দেড় মাসের ব্যবধানে ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামালের দাম ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজারে ডিমের দাম বাড়লেও স্বস্তি নেই টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের খামারি মো. আলম মন্ডলের। তার খামারে মুরগি রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। ফিড, ওষুধ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডিমের বাড়তি দামের সুফল তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বরং কমে আসছে মুনাফা। এ অবস্থায় আগামী মাস থেকে খামারের মুরগির সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এ খামারি।
 ‘বাজারে ডিমের দামে উত্তাপ রয়েছে, কিন্তু খামারিরা আদতে কতটা সুবিধা পাচ্ছেন? ডিমের দাম যখনই বেড়েছে, আমাদের ব্যয়ও তখন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ফিড, মেডিসিন, বিদ্যুৎ—সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে ব্যয়। কৃষকের পকেট আসলে যে যেভাবে পারে কাটে।’
আলম মন্ডলের হিসাবে, তার খামারে প্রতিদিন প্রায় ৭৫ বস্তা ফিড লাগে। এক মাসের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা দাম বাড়ায় শুধু ফিডেই মাসে অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ টাকা। একই সময়ে মুরগির ওষুধের পেছনে মাসিক ব্যয় ১০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮ হাজার। বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ব্যবহার বেড়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ ও ডিজেল মিলিয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে তার ব্যয়।
শুধু আলম মন্ডল নন, ফিডের দাম বাড়ায় একই ধরনের চাপে রয়েছেন দেশের ছোট ও প্রান্তিক খামারিরা। খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দফায় পোলট্রি ফিডের দাম বেড়েছে। আগস্টের শেষ দিকে কেজিপ্রতি প্রায় ২ টাকা এবং সপ্তাহখানেক আগে আরো আড়াই টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে।
ফিড শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এক-দেড় মাসের ব্যবধানে ফিড তৈরির প্রধান কাঁচামালের দাম ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ফিডের দাম সমন্বয় করতে হয়েছে তাদের। তবে কাঁচামালের তুলনায় ফিডের দাম কম বাড়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো লোকসানে রয়েছে।
, ‘পোলট্রি ফিডের উপাদানের প্রায় ৮৫ শতাংশই ভুট্টা ও সয়াবিন মিল। এক মাস আগেও যে ভুট্টা ৩০-৩১ টাকা কেজিতে কিনতাম, এখন সেটি ৩৮-৩৯ টাকা। আমদানি করা ভুট্টার দাম প্রায় ৪০ টাকা। একই সময়ে সয়াবিন মিলের দামও বেড়েছে।’
ফিডের কাঁচামালের দাম গড়ে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে উল্লেখ করে এ ব্যবসায়ী বলেন, ‘দেশের উৎপাদিত ভুট্টার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সয়াবিন মিলও প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের বাজারে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুই দফায় ফিডের দাম বাড়াতে হয়েছে। এর পরও প্রতি কেজিতে ৩-৪ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। কাঁচামালের দাম ২৫ শতাংশ বাড়লেও সে অনুপাতে ফিডের দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ফিড তৈরির প্রধান উপাদানগুলোর প্রায় সবক’টির দামই বেড়েছে। ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টা বর্তমানে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৩৮ টাকা ৮০ পয়সায়, যা এক মাস আগে ছিল ৩১ টাকা ৩০ পয়সা। ডিওআরবির (ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যান) দাম ২৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৩ টাকা। ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সা। আর সয়াবিন মিলের দাম ৫৫-৫৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৬-৭০ টাকা।
ফিড শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, মার্চ থেকে মে—এ মৌসুমে দেশে উৎপাদিত ভুট্টা প্রতি কেজি ২৮-২৯ টাকায় পাওয়া যায়। কিন্তু জুলাই-আগস্টে এর দাম বেড়ে ৩৮-৪০ টাকায় ওঠে। সাধারণত জুলাইয়ের মধ্যেই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভুট্টার মজুদ শেষ হয়ে যায়। এরপর আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে দেশীয় বাজারেও।
ফিড শিল্পের ব্যয় কাঠামোতেও কাঁচামালের গুরুত্ব অনেক বেশি। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মানসম্মত পোলট্রি ও গবাদিপশুর ফিড উৎপাদনে মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশই কাঁচামাল সংগ্রহে ব্যয় হয়। ভুট্টা, সয়াবিন মিল, রাইস ব্র্যান ও ডিওআরবির মতো মৌলিক উপাদানের দাম বাড়লে ফিড মিলগুলোর উৎপাদন ব্যয়ও সরাসরি বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক বাজারেও সাম্প্রতিক সময়ে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী ট্রেডিং ইকোনমিকসের হিসাবে, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরের এ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে সয়াবিন মিল বা খৈলের গড় দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে গমের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভুট্টার ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
এদিকে ফিডের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে সরাসরি খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ে। টাঙ্গাইলের আরেক খামারি আব্দুল মালেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফিডের দাম কেজিতে সাড়ে ৪ টাকা বেড়েছে। আগের দামেই আমরা টিকে থাকতে পারছি না। এভাবে চলতে থাকলে খামার বন্ধ করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।’
ফিডের মূল্যবৃদ্ধির আগে থেকেই নানা ধরনের ব্যয়চাপে রয়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। বড় বাণিজ্যিক খামারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাদের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এর সঙ্গে ফিড, বাচ্চা, ওষুধ, ভ্যাকসিন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠেছে বলে জানান পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পোলট্রির সবচেয়ে বড় ব্যয় ফিডে। এটির দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এমনিতেই প্রতি বছর অসংখ্য ক্ষুদ্র খামারি ঝরে যাচ্ছেন। এক কেজি মাংস উৎপাদন করতে মুরগিকে দেড় কেজি ফিড খাওয়াতে হয়। কেজিতে সাড়ে ৪ টাকা দাম বাড়ায় ফিডেই তার প্রতি কেজিতে গড়ে ৬ টাকা উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এরপর বিদ্যুৎ খরচ, জেনারেটরের জ্বালানির ব্যয় কিংবা পরিবহন—সব জায়গায় ব্যয় বেড়েছে।’
খামারির ব্যয় কমাতে ফিডের দাম কমানোর পরামর্শ দিয়ে ড. বজলুর রহমান বলেন, ‘সরকার এক্ষেত্রে ফিডের উৎপাদন স্তরে সাময়িকভাবে ট্যাক্স হলিডে দিতে পারে। কাঁচামালের দাম স্বাভাবিক হলে পরে সেটি তুলে দেয়া যাবে। তাছাড়া খামারিদের বিদ্যুৎ বিল শিল্পের হিসাবে নেয়া হয়। তাদের কৃষি খাতে যুক্ত করলে বিদ্যুতে ছাড় পাবে। এর মাধ্যমেও খামারিদের ব্যয় কমানো যাবে। মেডিসিনের উচ্চ দামকেও নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। অন্যথায় এ খাতের পাশাপাশি ভোক্তার ওপর চাপ আরো বাড়বে।’
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ) সম্প্রতি জানিয়েছে, উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি উপকরণের দাম বাড়লেও খামার পর্যায়ে মুরগি ও ডিমের দামের সঙ্গে সে ব্যয়ের সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি। ফলে প্রান্তিক খামারিরা দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনছেন। অনেকে খামার বন্ধ করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের আগে দেশে পোলট্রি খামারির সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ। ধারাবাহিক লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারমূল্যের অস্থিতিশীলতা, সহজ শর্তে অর্থায়নের অভাবসহ বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার কারণে বর্তমানে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজারে। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি এ খাত থেকে ঝরে পড়েছেন। ফিডের কাঁচামালের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সে সংকটকেই আরো ঘনীভূত করছে।
 ‘বৈশ্বিক ও দেশের বাজারে ফিডের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। আবার ফিডের দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। তারা এজন্য চাপে আছেন।’
বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশে ফিরে ফিড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধি এবং খামারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসব। একটা সমাধান বের করার চেষ্টা করব। সরকার প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *