
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য অনেকটাই উন্মোচিত, দাবি পুলিশের
সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬
আমরা পাপের ভাগ নিতে রাজি হবো না: জামায়াত আমির
সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬সারা দেশেই মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুঁড়িয়ে চলছে বলে মতপ্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মানসিক রোগ কিংবা সমস্যার চিকিৎসাকে এখনো বিলাস হিসেবে ধরা হয়। এজন্য অনেকেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে প্রয়োজনীয় মানসিক সাপোর্টটা পান না।’
একমাত্র কন্যাসন্তানকে হারিয়ে মা সোমা রহমান (ছদ্মনাম) এখন শোকে পাথর। জীবনের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতে তার কোলজুড়ে এসেছিল ‘পূর্ণ রহমান’। মেয়ের বয়স থেমে গেছে সাত মাসে, প্রথম জন্মদিনটিও পালন করতে পারেননি মা। জুলাইয়ের শেষদিকে হামে কন্যাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন সোমা। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু অপেক্ষায় আছি মেয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার। আল্লাহ যেন খুব তাড়াতাড়ি আমাকে তার কাছে নিয়ে যান। এ পৃথিবী আমার জন্য জাহান্নাম।’
মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে হাম ও উপসর্গে মারা গেছে ১ হাজার ৫৩ জন, যাদের প্রায় সবাই শিশু। মারা যাওয়া শিশুদের পরিবারগুলো মুখোমুখি হচ্ছে এক ট্র্যাজিক পরিস্থিতির। শিশুদের মা-বাবাদের শোক, মানসিক চাপ, বিষণ্নতা, আর্থিক ধাক্কায় অনেক পরিবার রীতিমতো ভাঙনের মুখে। বিশেষ করে কম বয়সে বিয়ে হওয়া তরুণী মায়েরা সন্তান হারানোর শোক ও পরিবারের নানাবিধ চাপ সামলাতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন।
সোমা রহমান এ প্রতিবেদককে শুনিয়েছেন তার কথা। হামে আক্রান্ত অসুস্থ মেয়েকে সুস্থ করে হাসপাতাল থেকে একসঙ্গে বাড়ি ফিরবেন। মনে মনে মেয়েকে এমনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি রাখা সম্ভব হয়নি। ‘পিআইসিইউতে গিয়ে দেখি মেয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম তোমাকে বাসায় নিয়ে যাব। দেখলাম মেয়েটা কথা শুনে চোখ দুটো বন্ধ করল। ভেবেছিলাম কথা শুনে মেয়ে শান্তি পেয়েছে তাই চোখ বন্ধ করেছে। আর আমার মেয়েকে চোখ খোলা অবস্থায় দেখিনি।’
এ পর্যন্ত বলে স্বগতোক্তি করে ওঠেন, ‘মেয়েকে দেয়া কথাও আমি রাখতে পারিনি। মন থেকে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না।’
সোমার গল্পের সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে সাইমা সুলতানার (ছদ্মনাম)। আগস্টের শুরুতে তার নয় মাসের কন্যা আরিশা মনিকে হারিয়েছেন তিনি। বড় আরেকটি ছেলে থাকলেও শিশুকন্যাকে হারিয়ে একাকিত্ব আর বিষণ্নতায় ভুগছেন তিনি। স্বামী ও সন্তান নিয়ে ঢাকায় বাস করায় পরিস্থিতি যেন আরো জটিল হয়েছে। তার স্বামীও সন্তানের শোকে কাবু। কেউ কাউকে সান্ত্বনা দিতে পারেন না। এমন শোক আর বিষণ্নতায় দূরত্ব বাড়ছে তাদের মধ্যেও।
দক্ষিণাঞ্চলের এক জেলা শহরের মেয়ে সাদিয়াও হামে সন্তান হারিয়েছেন। স্বামী ও পরিবার পাশে থাকলেও সন্তানের শোক ও ভবিষ্যৎ সাংসারিক অনিশ্চয়তায় মুহ্যমান তিনি। মেজাজ খিটমিটে হয়ে গেছে তার। ঘরজুড়ে সন্তানের স্মৃতি। অন্য কোনো শিশুকে দেখলেই চিৎকার করে কেঁদে ফেলেন সাদিয়া। জানা যায়, এপ্রিলে সন্তান হারানোর পর থেকে মানসিকভাবে পুরোপুরি স্থিতিশীল নেই তিনি। অল্প বয়সেই মা হয়েছিলেন। গর্ভাবস্থায় নানা জটিলতা দেখা দিয়েছিল। আর কখনো সন্তান না নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। হামে সেই আরাধ্য সন্তান হারিয়ে সাদিয়ার শোক ফুরাচ্ছে না।
সাদিয়ার স্বামী তার শারীরিক ঝুঁকি বিবেচনা করে পাশে থাকলেও একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তিনিও শোকগ্রস্ত। সাদিয়ার মা-বাবা বলছেন, সন্তান না থাকলে স্বামী-শ্বশুরবাড়ির মন পরিবর্তন হতে কতক্ষণ! মেয়ের সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তারা।
জানতে চাইলে মনোবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম বলেন, ‘নারীর আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমি নারী সেটা আমার পরিচয় না, আমি একটা মানুষ সেটা হচ্ছে আমার প্রথম পরিচয়। নারীদের মনে রাখতে হবে যে আমিও একজন মা এবং মা হিসেবে যতটুকু করার ছিল (তা করেছি)…আমাদের সাধ্যের তো একটা সীমাবদ্ধতা আছে।’
সারা দেশেই মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুঁড়িয়ে চলছে বলে মতপ্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘মানসিক রোগ কিংবা সমস্যার চিকিৎসাকে এখনো বিলাস হিসেবে ধরা হয়। এজন্য অনেকেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তে প্রয়োজনীয় মানসিক সাপোর্টটা পান না।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুদের প্রায় অর্ধেকের বয়সই নয় মাসের কম। হামে বা উপসর্গে এ রকম শিশুসন্তার হারানো অনেকগুলো পরিবারের সঙ্গে কথা বলে দেখে গেছে, উপযুক্ত মানসিক, পারিবারিক সমর্থনের অভাবে সদ্য সন্তান হারানো মায়েরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এদের অনেকেই অল্পবয়সী ও প্রথমবারের মতো মা হয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে এখনই সমন্বিত জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ, জোরদার টিকাদান কর্মসূচি ও সন্তানহারা মায়েদের জন্য দ্রুত মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং সেবা চালু করা জরুরি।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুসন্তান হারানো মায়েদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। সিরিয়ায় টিকা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় হাম ও নিউমোনিয়ায় অনেক শিশুর মৃত্যু হয়। সেখানে সন্তান হারানো নারীদের মানসিক রোগও মহামারী আকার ধারণ করে। এছাড়া ইউক্রেনে হাসপাতাল ধ্বংস ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় নবজাতক মৃত্যুহার বেড়েছে। ইউএনএফপিএ তাদের প্রতিবেদনে জানায়, সন্তানহারা নারীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার ভয়াবহভাবে বেড়েছে।
দেশে নারীর অধিকার রক্ষা ও ক্ষমতায়নে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করা খুশী কবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সন্তান হারানোর পর মায়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুদিকের পরিবারের নানাজন থেকে আসা বহুমুখী চাপের ফলে সংসারগুলো আজ ভাঙনের মুখে। যখন কোনো অঘটন বা শিশুমৃত্যু ঘটে, তখন অল্পবয়সী মায়েরা দুর্বল হয়ে পড়ে। তার কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব থাকে না।’
হাম ও উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মায়েদের সংখ্যাও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অনেক মায়ের শোক সামনে আসছে। এ মায়েদের জন্য কাউন্সেলিংয়ের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন মনোবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একেএম রেজাউল করিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সন্তান হারানো যেকোনো পিতা-মাতার জন্য বড় ট্রমাটিক ও মানসিক যন্ত্রণার অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে প্রথম শিশুসন্তান হারানো শোকের বোঝা আরো ভারী। যে মায়ের বুক খালি হয়েছে, তার সন্তান হারানোর অবর্ণনীয় কষ্ট ও শূন্যতা বাইরের কারো পক্ষে পুরোপুরি অনুভব করা সম্ভব নয়।’
তিনি ব্যাখ্যা করেন, বর্তমান যুগে গর্ভধারণ আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ চিকিৎসা ও আকুল প্রার্থনার পর যখন একটি শিশু জন্ম নেয়, তখন তাকে ঘিরে বাবা-মায়ের প্রত্যাশা ও স্বপ্ন থাকে অসীম। তাই সে সন্তানের মৃত্যু তাদের জীবনে এক ভয়াবহ মানসিক বিপর্যয় তৈরি করে।
অধ্যাপক ড. একেএম রেজাউল করিম আরো বলেন, ‘এ সংকট কাটাতে পেশাদার কাউন্সেলিং জরুরি হলেও পরিবার, বিশেষ করে স্বামীর সহমর্মিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও সামাজিক সহমর্মিতা অনেক সময় পেশাদার সেবার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়।’


