বিদায় ‘কুইন অব কান্ট্রি মিউজিক’ ডলি পার্টন
আগস্ট ২৬, ২০২৬
ঠাকুরগাঁওয়ে তিন পরিবহনের সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৪
আগস্ট ২৬, ২০২৬
বিদায় ‘কুইন অব কান্ট্রি মিউজিক’ ডলি পার্টন
আগস্ট ২৬, ২০২৬
ঠাকুরগাঁওয়ে তিন পরিবহনের সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৪
আগস্ট ২৬, ২০২৬

ঢাকার লেকগুলো পরিণত হয়েছে অভিজাত এলাকার পয়োবর্জ্যের আধারে

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৩ সালে সোয়া ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় হাতিরঝিল প্রকল্প। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নৌ-যোগাযোগ সৃষ্টি করে রাজধানীর যানজট নিরসন।
এছাড়া আশপাশের এলাকার বৃষ্টির পানি ধারণ করে জলাবদ্ধতা নিরসনও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রকল্পের নথিতে আরো বলা হয়েছিল, রাজধানীবাসীর মাছের চাহিদা মেটাতে জলাশয়ে চাষ হবে নানা প্রজাতির মাছ। নগরবাসীর জন্য থাকবে সাঁতার কাটার ব্যবস্থাও।
বিপুল ব্যয়ে নির্মিত লেকটি এখন আশপাশের এলাকার সুয়ারেজ বর্জ্যের আধারে পরিণত হয়েছে। নামে মাত্র সচল রয়েছে নৌ-যোগাযোগ। হাতিরঝিলে ময়লা পানির দুর্গন্ধ ঠেলে আংশিক নৌ-যোগাযোগ টিকে থাকলেও ঢাকার অন্য বড় তিনটি লেক ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানীর তাও নেই। বরং হাতিরঝিলের মতো এ লেকগুলোও অভিজাত বাসিন্দাদের পয়োবর্জ্যের ঠিকানায় পরিণত হয়েছে। সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েও লেকের পানির স্বাভাবিক রঙ পর্যন্ত ফিরিয়ে আনতে পারছে না।
নগর বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরের পর বছর ঢাকার লেকগুলো পয়োবর্জ্যের কারণে বাস্তুতন্ত্র হারিয়ে ফেলেছে। জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এ লেকগুলো গড়ে তোলা হলেও অভিজাত এলাকার বাসিন্দারা এর অপব্যবহার করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ এবং রাজউকের বোর্ড সদস্য অধ্যাপক আখতার মাহমুদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার লেকগুলোর লোকেশন কোথায়? ধানমন্ডি, গুলশান, বনানীর মতো অভিজাত এলাকায়।
অর্থাৎ তুলনামূলক দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত এলাকার মানুষের জন্য ভালো পার্ক, লেক বানানোর চিন্তাই করেনি রাষ্ট্র।’
তিনি আরো বলেন, ‘জনগণের টাকায় সরকারি তিন-চারটি লেক নির্মাণ করলেও সেগুলোর পরিবেশ জঘন্যতম হয়ে আছে। লেকপাড়ের বাসিন্দারা মলমূত্র ও সব ধরনের বর্জ্যের ভাগাড় বানিয়ে ফেলেছে। এ লেকগুলোতে কোনো মাছ নেই, পাখি নেই, জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব নেই। এগুলোর পাশে গিয়ে বসা ও সুস্থভাবে নিশ্বাস ফেলার কোনো সুযোগ নেই। অথচ লেকগুলো যদি সঠিকভাবে ফাংশন করত, নৌ-যোগাযোগ তৈরি হতো, তাহলে বিদেশের মতো সৌন্দর্যমণ্ডিত হতো একেকটি লেক। রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।’
রাজধানীর অন্যতম অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী ও বারিধারা। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কূটনীতিকদের বাসস্থান রয়েছে এ এলাকাগুলোয়। দেশের অনেক বড় ব্যবসায়ী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদেরও বসবাস এখানে। এ এলাকায় রয়েছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়—গুলশান-বনানী লেক। এ জলাশয়কে ২০০১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু এরপর গত আড়াই দশকেও অভিজাত এলাকার এ লেককে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। গুলশান লেকে কোথাও কয়েক ইঞ্চি থিকথিকে ময়লার স্তর তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বর্জ্য পচে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এ জলাশয় হয়ে উঠেছে মশা-মাছির আবাসস্থল। লেক থেকে আসা দুর্গন্ধে দুই পাশের ভবনের ছাদ কিংবা বারান্দায় বসতে চান না বাসিন্দারা। দুর্গন্ধ আর মশা-মাছি থেকে বাঁচতে বাসার দরজা-জানালা বন্ধ রাখেন অনেকে।
রাজধানীর আরেক পুরনো অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি। এ এলাকায় আছে সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ লেক। গত এক দশকের বেশি সময়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ধানমন্ডি লেক তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, নতুন করে লেকটিতে আবাসিক ভবনের পয়োবর্জ্যের সংযোগ দেয়া হয়েছে। অবাধে লেকে ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্য। এসব কারণে লেকের পানি নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। কমে গেছে মাছ ও জলজ উদ্ভিদের পরিমাণ। মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লেকপাড়ে বসতি গড়া পাখপাখালিও।
রাজধানীর লেকগুলো নৌ-যোগাযোগ সুবিধাসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পেছনে ওয়াসার বড় ধরনের দায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব, যিনি ধানমন্ডি লেক ও হাতিরঝিল লেক প্রকল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা যেসব উদ্দেশ্য সামনে রেখে লেকগুলো উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলাম, তা কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছে না। লেকগুলোর কাছে দুর্গন্ধে ঘেঁষা যায় না। এর বড় কারণ হিসেবে মনে করি ওয়াসার লাগাতার প্রতিশ্রুতি প্রতিপালনে ব্যর্থতা আর দশকের পর দশক ধরে ঢাকাবাসীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নামে প্রতারণা। তাদের পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক সামর্থ্য পুরো ঢাকা শহরের মাত্র ১৭ শতাংশ। যদিও এ দাবি নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে; তবু তাদের এ দাবি অনুযায়ী, বাকি ৮৩ শতাংশ বর্জ্যের ঠিকানা হয় এ লেক ও খালগুলো। ফলে রাজউক, সিটি করপোরেশন চাইলেও লেকগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে পারছে না। আবার লেকপাড়ের বাসিন্দারাও ময়লা ফেলার ক্ষেত্রে বেপরোয়া আচরণ করে যাচ্ছে। সব মিলিয়েই ঢাকার লেকগুলোকে নির্মল জলাধার না বলে তরল বর্জ্যের ডাম্পিং বললেই যথোপযুক্ত হয়।’
ওয়াসার পয়োবর্জ্যের কারণে ঢাকার সিটি করপোরেশগুলো সঠিকভাবে নাগরিক সেবা দিতে পারছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের ভাষ্যমতে, ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন সিটি করপোরেশনের বৃষ্টির পানির সংযোগে দিয়ে দেয়া হয়েছে। যে কারণে বৃষ্টি হলে পানির স্রোত পার্শ্ববর্তী লেক ও খালে যেতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা আসলে অসহায়। স্টর্ম ড্রেনেজে ওয়াসা সুয়ারেজ লাইন দিয়ে রেখেছে। এখন নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে হিমশিম খাচ্ছি আমরা। একটি লেক, খাল যখন আবর্জনায় দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ে তখন সেটি আর মানুষ ব্যবহার করতে চায় না। সেখানে গিয়ে বসে না। সে পানি ব্যবহার করে না। সেখানে নৌকায় চড়ে না। এভাবে ধীরে ধীরে খাল-লেক দখল হয়ে যায়। আমরা প্রত্যাশা করব, লেকগুলো যেন সঠিক ব্যবস্থাপনায় ফিরে আসে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *