
বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপরে তিস্তার পানি
আগস্ট ৬, ২০২৬
ডিটিসিএর তথ্য ঢাকার প্রতি চার বাসের একটি আনফিট
আগস্ট ৬, ২০২৬ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে বিচারকাজ চলবে বলেও তিনি জানান।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সরকারপ্রধান এ আশ্বাস দেন।
আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তিদের পরিবারের শোকাহত সদস্যদের আশ্বস্ত করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘বর্তমান সরকার মনে করে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্যই প্রতিটি অপরাধের বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। গত ১৭ বছর এবং জুলাই আন্দোলনে যে মানুষগুলো শহীদ হয়েছেন এবং গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের নামে নিজেদের এলাকায় যেকোনো একটি প্রতিষ্ঠানের নামকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করে, এ জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়। এ অভ্যুত্থানের মহানায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। আর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষ যেমন ভুলে যায়নি, একইভাবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও জনগণ কখনই ভুলবে না।’
দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে এ পরিস্থিতিতে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কিনা, সেটি ভেবে দেখার আহ্বান জানাই। আজকের দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর ঘরছাড়া হয়েছিলেন। শুধু জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেই শহীদ হয়েছেন হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেও গণতন্ত্রকামী জনগণকে হত্যা করেছিল। পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা, এমন বর্বরতা সভ্য জগতে বিরল। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম-খুন ও অপহরণকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা এ নৃশংসতা শুধু স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গেই তুলনা চলে।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহসী ইতিহাস তুলে ধরবে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘এ জাদুঘর নতুন প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত করবে বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশ। এ স্মৃতি জাদুঘর আমাদের জনগণের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে ধারণ করার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ।’ প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এ জাদুঘর শুধু ২০২৪ সালের নৃশংস ঘটনার স্মারক হবে না, বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্পর্ক তুলে ধরবে। তিনি বলেন, ‘শুধু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানই নয়, এখানে বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও সংরক্ষিত থাকা জরুরি।’
বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী চক্র কখনই দেশে গণতান্ত্রিক শাসনকে মেনে নিতে পারেনি বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘তাদের পূর্বসূরিরা ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে দেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এসব ইতিহাস জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই উপকৃত হবে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না; বরং ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে। ভবিষ্যৎ বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং প্রতিটি বিষয়ে যথাসম্ভব সত্যতা থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জাদুঘরে রাখা বিষয়াবলি সম্পর্কে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষায়ও উপস্থাপিত হলে বিশ্বের ভিন্নভাষী মানুষের বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সুবিধা হবে।’
আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধাদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৫০ জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি যোদ্ধাকে তাদের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে শ্রেণীভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহত ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সহায়তা করার ব্যাপারে বর্তমান সরকার আন্তরিক।’
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘জুলাই যোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বর্তমান সরকার শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠারও কাজ শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতাহারের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত “সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি” কাজ শুরু করেছে।’ দেশ পুনর্গঠনের মাধ্যমে, একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা শহীদদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়বেন বলেও জানান।
বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী গণ-অভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। শোকাহত শহীদ পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের অংশগ্রহণে দেশাত্মবোধক গান, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা, দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তুলে ধরা হয়। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ জোহরা, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি আবেগঘন স্মৃতিচারণা করেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন প্রমুখ। প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানও উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন, জুলাই যোদ্ধা, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক ব্যক্তি, গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।


