বাদ পড়েছে লিন্ডে ইউনিক হোটেলস ও কোহিনূর কেমিক্যালস
জুলাই ১৩, ২০২৬
আর্জেন্টিনার জয়রথ স্বাভাবিক নয়: মেসি
জুলাই ১৩, ২০২৬
বাদ পড়েছে লিন্ডে ইউনিক হোটেলস ও কোহিনূর কেমিক্যালস
জুলাই ১৩, ২০২৬
আর্জেন্টিনার জয়রথ স্বাভাবিক নয়: মেসি
জুলাই ১৩, ২০২৬

ইতিহাসের হিসাব চুকানোর সেমিফাইনাল

‘যে লাফায় না, সে ইংরেজ’—আর্জেন্টিনার গ্যালারিতে এ স্লোগান উঠলে হাজারো মানুষ একসঙ্গে লাফিয়ে ওঠে।

কণ্ঠে ঢেউ ওঠে, পতাকা দুলতে থাকে, নীল-সাদা জার্সির সমুদ্র কেঁপে ওঠে। বাইরে থেকে শুনলে মনে হতে পারে এটি প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে ছুড়ে দেয়া ব্যঙ্গ। কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এ স্লোগান অনেক গভীর। ইংল্যান্ডের সঙ্গে আলবিসেলেস্তেদের ঐতিহাসিক দ্বৈরথের প্রতীক। সেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। আগামী বুধবার আটলান্টায় ইতিহাসের হিসাব চুকানোর ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই দল। তার আগের দিন নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে স্পেন ও ফ্রান্স। সেখানে শিল্পের সঙ্গে গতির, অপূর্ণতার সঙ্গে প্রতিশোধের লড়াই। দুই বছর আগে ইউরোর আকাশে যে স্প্যানিশ ঝড় ফরাসি স্বপ্নকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল, বিশ্বকাপের এ জাদুকরী আলোয় এবার ঠিক সেটিরই প্রতিশোধ খুঁজবে কিলিয়ান এমবাপ্পের দল।

তবে সব রোমাঞ্চের কেন্দ্রবিন্দুতে যেন মিশে আছে সেই আকাশি-নীল উন্মাদনা। সুইসদের বিরুদ্ধে মেসিদের ম্যাচ শেষ হতেই গ্যালারিতে শোনা গেল ‘যে লাফায় না, সে ইংরেজ’ স্লোগান। যে গল্পের শুরু ১৯৬৬ সালে। লন্ডনের গ্রীষ্ম। ওয়েম্বলির আকাশে তখন ইংরেজ ফুটবলের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের সূর্য উঠছে। কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত কোনো গোল নয়। ছিল অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনের বহিষ্কার। জার্মান রেফারির সেই সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার কাছে ছিল অপমানের প্রতীক। রাত্তিন মাঠ ছাড়তে চাননি। তিনি বসে পড়েছিলেন লাল কার্পেটের ওপর। ইংল্যান্ড সেদিন জিতেছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনা বিশ্বাস করেছিল, তারা ম্যাচ হারেনি; কেড়ে নেয়া হয়েছে। সেদিনই দুই দেশের ফুটবল দ্বৈরথের প্রথম বীজ বপন হয়।

তার ষোলো বছর পর, ১৯৮২। দক্ষিণ আটলান্টিকের বরফশীতল জলরাশিতে শুরু হলো ফকল্যান্ড। আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস যুদ্ধ। মাত্র কয়েক সপ্তাহের সংঘর্ষে শত শত তরুণ প্রাণ হারাল। যুদ্ধ শেষ হলো, কিন্তু ক্ষত শুকাল না। মানচিত্রের একটি দ্বীপ হয়ে উঠল জাতীয় আবেগের প্রতীক। চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের ২২ জুন। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা লিখেছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত গল্প। প্রথম গোলটি এল হাত ছুঁয়ে। পৃথিবী তাকে নাম দিল ‘হ্যান্ড অব গড’। চার মিনিট পর সেই একই মানুষ বল পেলেন নিজের অর্ধ থেকে। একজন, দুজন, তিনজন, চারজন, পাঁচজন…ইংল্যান্ডের প্রতিরক্ষা যেন শুকনো পাতার মতো ঝরে পড়ল। পৃথিবী দেখল ‘শতাব্দীর সেরা গোল’।

একই ম্যাচে বিতর্ক আর সৌন্দর্য। প্রতারণার অভিযোগ আর শিল্পের বিস্ময়। পরে তিনি বলেছিলেন, সেটি ছিল ‘ঈশ্বরের হাত’। আবার অনেকের কাছে সেটি ছিল মালভিনাসের ক্ষতের জবাব। ফুটবল কোনো যুদ্ধের বিকল্প হতে পারে না, কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো ফুটবলের কাঁধে চেপেই নিজের ভাষা খুঁজে নেয়।

তার পরও সে দ্বৈরথ জমে উঠেছে আরো। ১৯৯৮ সালে সেন্ট এতিয়েনে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড, মাইকেল ওয়েনের দুরন্ত গোল আর টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার উল্লাস। ২০০২ সালে সাপ্পোরোতে ইংল্যান্ড অপেক্ষা করল ধৈর্য নিয়ে। বেকহামের পেনাল্টি যেন চার বছর আগের সব অপমানের উত্তর হয়ে এল। সেই জয়ের পর দুই দেশের কেটে গেছে ২৪ বছর।

পৃথিবী বদলেছে, ম্যারাডোনা চলে গেছেন। লিওনেল মেসি তার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণ করেছেন। ইংল্যান্ডে বেকহাম, জেরার্ড, ল্যাম্পার্ডের যুগ শেষ হয়েছে। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর ভেতরের বারুদটুকু একটুও কমেনি। আটলান্টার সবুজ ঘাস তাই এবার শুধু একটি মাঠ নয়। এটি হয়ে উঠবে স্মৃতির আদালতও। সেখানে নতুন কোনো ইতিহাস লেখা হবে। কেউ বলবে প্রতিশোধ, কেউ বলবে মুক্তি। শেষ পর্যন্ত হয়তো এটি শুধু একটি সেমিফাইনাল হিসেবেই নথিভুক্ত হবে। কিন্তু যারা ১৯৮৬-এর দুপুর, ১৯৯৮-এর রাত কিংবা ২০০২-এর সেই পেনাল্টির স্মৃতি বয়ে বেড়ান, তাদের কাছে এটি তার চেয়ে অনেক বড় কিছু।

কোথাও হয়তো লিওনেল মেসি শান্ত চোখে শেষ আরেকটি ইতিহাস লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোথাও জুড বেলিংহাম নতুন প্রজন্মের ইংল্যান্ডকে অতীতের ছায়া থেকে বের করে আনার স্বপ্ন দেখছেন। আর এ মর্ত্যের কোলাহল থেকে অনেক ওপরে হয়তো ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা তার সেই চিরচেনা জাদুকরী হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছেন সবুজ মাঠটার দিকে। চোখের কোণে জমে থাকা অনন্তকালের মায়া নিয়ে তিনি কি তবে আবারো স্বর্গের দরজায় কড়া নেড়ে বলছেন, আর একবার…শুধু আর একবার।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *