
ইতিহাস গড়ে স্পেনকে রুখে দিল কেপ ভার্দে
জুন ১৬, ২০২৬
গণমাধ্যমের আনুগত্য কেবল সত্যের প্রতি, জনগণের প্রতি: আসিফ মাহমুদ
জুন ১৬, ২০২৬তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধ বন্ধে কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার ঘোষণাও এসেছে। উভয় পক্ষ থেকেই সমঝোতায় পৌঁছার খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে।
অবশ্য জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের আগে ফ্রান্সে গতকাল গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, সমঝোতা চুক্তিটি পুরোপুরি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর পাশে বসে ট্রাম্প বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি ইতিমধ্যে আংশিকভাবে খুলে দেয়া হয়েছে এবং শুক্রবার এটি সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা হবে।’
জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সমঝোতা চু্ক্তিতে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও আলোচক দলের নেতৃত্ব দেয়া মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সই করেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি তেহরান। এরকটি সূত্র জানায়, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক সই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এদিকে দু দেশের মধ্যে সমঝোতার খবরের পরই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে গেছে।
চুক্তির বড় দিক হচ্ছে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ এ নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। কয়েক মাস ধরে ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সমঝোতার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া হবে। একই সঙ্গে ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধও তুলে নেয়া হবে। ট্রাম্প তার বার্তায় লিখেছেন, ‘বিশ্বের জাহাজগুলো আবার যাত্রা শুরু করুক। তেল প্রবাহিত হোক।’
এ ঘোষণার পর পরই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়। গতকাল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডে জ্বালানি তেলের দাম ৮৩ দশমিক শূন্য ৫ ডলারে নেমে আসে। বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলসহ বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের উত্থান। জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক নিক্কেই ২২৫ এক লাফে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া তাইওয়ানের তাইএক্স ২ দশমিক ৭ ও অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স২০০ সূচক প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
ইতিবাচক হাওয়া লেগেছে মার্কিন শেয়ারবাজারেও। নিয়মিত লেনদেনের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও প্রযুক্তিপ্রধান নাসডাক ফিউচার যথাক্রমে ১ ও ১ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। তবে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কারণ কয়েক মাসের সংঘাতের পর প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য নৌ-মাইন অপসারণে সময় লাগতে পারে।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে জটিলতা এখনো অমীমাংসিত। বর্তমান সমঝোতায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং আগামী ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে এ নিয়ে আলাদা আলোচনা হবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে আগামী দুই মাস আলোচনা চলবে। পারমাণবিক কর্মসূচিও সেই আলোচনার অংশ হবে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের জানিয়েছে, খসড়া চুক্তির ১৪ দফার মধ্যে একটি হলো ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুর স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা। ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ চুক্তিতে ইরানকে শুধু বেসামরিক প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেয়া হবে। বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিই আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি।
চুক্তি ঘোষণার আগে রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ২৫ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে সম্মত হতে পারে। এ তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। যদিও এটি এখনো একটি কাঠামোগত সমঝোতা, তবু যুদ্ধ শুরুর পর এটিকেই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি লেবানন প্রশ্ন। আলোচনার পুরো সময়জুড়েই বিষয়টি ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। ইরান বারবার দাবি করে আসছিল, লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ না হলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি সম্ভব নয়। অন্যদিকে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছিল।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানিয়েছে, গতকাল রাত থেকেই লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, লেবাননের বিরুদ্ধে সব ধরনের ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করতে হবে এবং এ সমঝোতা বাস্তবায়নের দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে, রোববার মধ্যরাতের আগে হিজবুল্লাহ সর্বশেষ হামলা চালায়। এর পর থেকে আর কোনো অভিযান পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ইসরায়েলি হামলার মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
তবে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননের দখলকৃত এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য কোনো চাপ মেনে নেয়া হবে না।
ইসরায়েলের ভেতরে চুক্তিটি নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে। বিরোধী নেতারা বলছেন, ইরানকে দুর্বল করার যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা অর্জিত হয়নি। এমনকি হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টিও চুক্তিতে স্পষ্টভাবে নেই। ফলে নেতানিয়াহু সরকারের সমালোচনা আরো জোরালো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকেও এ সমঝোতাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিলে তারা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে প্রস্তুত। চীনও সমঝোতাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।


