সরকারি থেকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার সফল উদাহরণ পূবালী ও উত্তরা ব্যাংক
মে ২০, ২০২৬
বিলুপ্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের সব কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত
মে ২০, ২০২৬বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক জটিল ও সমাধান করা যায় না এমন সমস্যা রয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কিছু জরুরি বিষয়কে অবহেলা করে যাচ্ছে। অথচ এগুলোর সমাধান সম্ভব।
বিষয়টি দুঃখজনক। বিগত কয়েক দশকের অভূতপূর্ব অগ্রগতির পর বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি স্থবির হয়ে পড়েছে। এটি এমন অবহেলারই অন্যতম উদাহরণ। জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সভায় অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বনেতারা এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। এক্ষেত্রে তাদের শিশুদের টিকা দেয়ার বিষয়ে নতুন প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, যেটিকে সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ বলা হয় অথবা লাখ লাখ শিশুর স্বাস্থ্য অরক্ষিত ও ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়া হবে।
গত অর্ধশতাব্দীতে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে ১৫ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। টিকাদান শিশু মৃত্যুহার কমানোর অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায় হিসেবে প্রমাণিত। জন হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে টিকাদানের পেছনে খরচ করা প্রতিটি ডলার স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় হ্রাস, মজুরি রক্ষা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০ ডলার সাশ্রয় করে। আর দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের সামগ্রিক সুবিধার কথা বিবেচনা করলে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ ডলারেরও বেশি।
যদি একেবারে নতুন করে কোনো জনস্বাস্থ্য উদ্যোগের নকশা করতে বলা হয়, তবে টিকাদানের চেয়ে ভালো কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব আজ এ অকাট্য সত্যটি ভুলে যাচ্ছে যে ভ্যাকসিন বা টিকা জীবন বাঁচায়। উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থাকা উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে টিকা নিয়ে সংশয় ও গুজবের কারণে টিকাদানের হার কমছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অর্থায়ন মারাত্মকভাবে ধসে পড়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এভাবে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিগত কয়েক দশকের অগ্রগতি এবং সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের ঝুঁকি এড়ানোর সম্ভাবনার ভিত্তিও এখন ঝুঁকির মুখে।
বর্তমানে স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়া দেশগুলো অর্থায়নে কাটছাঁট করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলোর ওপর। বিশ্বে যে ১ কোটি ৪০ লাখ শিশু কখনই কোনো টিকা পায়নি, তাদের প্রায় অর্ধেকই বাস করে এসব এলাকায়। মহামারীজনিত বিঘ্নতার পর থেকে এ অঞ্চলগুলোতে টিকাদান প্রক্রিয়া থমকে গেছে। এ এলাকার শিশুরা স্বাভাবিক পরিবেশের শিশুদের তুলনায় অর্থাৎ পাঁচ বছর বয়সে পৌঁছার আগেই মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এ ঝুঁকিও তিন গুণ বেশি (নিউইয়র্ক বা ক্যালিফোর্নিয়ার শিশুদের তুলনায় ঝুঁকির মাত্রা ১০ গুণের বেশি)। অবশ্য টিকাদানের ঘাটতি সবার জন্যই ঝুঁকি তৈরি করছে। মহামারী ছড়াতে পারে এমন রোগগুলোর ৭০ শতাংশেরও বেশি এখন ভঙ্গুর ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো থেকেই ছড়াচ্ছে।
সমস্যাটি যেমন স্পষ্ট, এর সমাধানও তেমনি পরিষ্কার। এ বঞ্চিত শিশুদের কাছে টিকা পৌঁছে দেয়ার জন্য বিনিয়োগ করতে হবে এবং এমন দুর্গম পরিবেশের উপযোগী সরবরাহ ব্যবস্থা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য বেশি খরচের প্রয়োজন নেই। আমি যে আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটির (ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি বা আইআরসি) নেতৃত্ব দিচ্ছি, তার একটি উদ্যোগ হলো ‘রিচ’ (রিচিং এভরি চাইল্ড ইন হিউম্যানিটারিয়ান সেটিংস)। এ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা দেখিয়েছি যে সক্রিয় যুদ্ধাঞ্চলের মধ্যেও একটি শিশুকে একটি টিকার ডোজ দিতে ২ ডলারেরও কম খরচ হয়।
২০২২ সাল থেকে ‘গাভি’-দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের অর্থায়নে ‘রিচ’ প্রকল্প সাদ, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও দক্ষিণ সুদানে তিন কোটিরও বেশি টিকার ডোজ সরবরাহ করেছে; যার মাধ্যমে ১০ লাখের বেশি ‘জিরো-ডোজ’ (একটি টিকাকরণও না হওয়া) শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এ মডেলটি সফল হওয়ার কারণ হলো এটি স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী এবং এমন একঝাঁক আঞ্চলিক অংশীদারদের ওপর নির্ভর করে কাজ করে যারা ওখানকার পরিবেশ ভালো বোঝেন এবং দুর্গম ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছার জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। ফলস্বরূপ সরকার বা কোনো বাইরের সংস্থা যেখানে পৌঁছাতে পারে না, তারা সেখানেও কাজ করতে সক্ষম হন।
উচ্চ-প্রভাবশালী এবং কম খরচের এ উদ্যোগ আবারো প্রমাণ করে যে ‘দুর্গম’ মনে হওয়া শিশুদের কাছে পৌঁছার জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা করাই বর্তমান বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে অর্থের সেরা সদ্ব্যবহার। এখন গাভির নিজস্ব তহবিল চাপের মুখে রয়েছে। এমন সময়ে আন্তর্জাতিক নেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা ভঙ্গুর ও সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোর জন্য তৈরি এ মডেল এবং এ ধরনের অন্যান্য উদ্যোগের পরিধি আরো বাড়াতে প্রস্তুত কিনা।
যদি তারা প্রস্তুত থাকেন, তবে তাদের দুটি অগ্রাধিকারের ওপর মনোযোগ দিতে হবে। প্রথমত, প্রমাণের ভিত্তিতে অর্থায়ন করতে হবে। এর অর্থ হলো সুনির্দিষ্টভাবে সেসব জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কাজ করতে হবে, যারা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। কারণ এখানেই ‘জিরো-ডোজ’ শিশুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ জনগোষ্ঠীগুলোকে একটি বিশেষ এবং শীর্ষ অর্থায়নের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যার জন্য থাকবে দীর্ঘমেয়াদি বহুবার্ষিক অর্থায়ন এবং ফলাফলের স্পষ্ট জবাবদিহি। কতজন শিশুর কাছে পৌঁছানো গেল এবং কত খরচে পৌঁছানো গেল—তা দিয়েই সাফল্য পরিমাপ করা সম্ভব এবং তা-ই করা উচিত। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক নেতাদের শুধু টিকার ডোজের জন্য নয়, এ মডেলটি সচল রাখার জন্যও অর্থায়ন করতে হবে। সবচেয়ে দুর্গম স্থানগুলোতে টিকাদান সম্ভব করতে হলে স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থার পেছনে বিনিয়োগ করা জরুরি। এ দলগুলো, যা প্রায়ই বিভিন্ন নাগরিক সমাজ ও সামাজিক সংগঠনের অংশীদারদের নিয়ে গঠিত, তারাই সংঘাত ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে শেষ প্রান্তের মানুষের কাছে টিকা পৌঁছে দেয়ার মূল চালিকাশক্তি।
টিকাদান কর্মসূচি চালুর ক্ষেত্রে একটি নৈতিক ও অর্থনৈতিক তাগিদ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ‘জিরো-ডোজ’ শিশু থাকা এলাকাগুলোতে টিকা পৌঁছে দেয়া কোনো মামুলি বা প্রান্তিক প্রচেষ্টা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি রিটার্ন বা সুফল এনে দেয়া বিনিয়োগগুলোর একটি। নীতিনির্ধারকদের সামনে থাকা পছন্দটি অত্যন্ত স্পষ্ট। সামান্য খরচে লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করা অথবা ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদে এর মানবিক বিপর্যয় ও পরিণতি ভোগ করা।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ২০২৬]
ডেভিড মিলিব্যান্ড: যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী; প্রেসিডেন্ট ও সিইও, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)


