
কাস্টমস ব্যবস্থাপনার অটোমেশন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬
দুই সন্তানসহ রেললাইনে ঝাঁপ দিলেন মা, ট্রেনে কাটা পড়ে সবার মৃত্যু
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালের ২০ মার্চ। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এটি শুধুই জাদুঘর ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার এটিকে জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করে।
রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৩ সালের ২০ মার্চ। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এটি শুধুই জাদুঘর ছিল। স্বাধীনতার পর ১৯৮৩ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশ সরকার এটিকে জাতীয় জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা করে। প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ১১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো স্মার্ট মিউজিয়াম ব্যবস্থাপনার কোনো ছোঁয়া লাগেনি জাদুঘরটিতে। একবিংশ শতাব্দীর সময়ে বাংলাদেশের জাদুঘর শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কাচের ভেতরে রেখে প্রদর্শনী পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেত্রকোনা জেলার আবদুর রহিম সপরিবারে এসেছেন রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর পরিদর্শনে। জাদুঘর দেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২০ বছর আগে যেমন দেখেছি, এখনো তেমনই রয়ে গেছে। কিছু গ্যালারি হয়তো নতুন সংযোজন হয়েছে বা নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এশিয়ার অন্যান্য দেশের জাদুঘরগুলো যেভাবে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে এখানে তার কিছুই নেই।’
এ দর্শনার্থী আরো বলেন, ‘আমাদের জাদুঘর ব্যবস্থাপনা এখনো শত বছর আগের মতো শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটা কাচের মধ্যে রেখে প্রদর্শন করা হচ্ছে। অথচ এশিয়ার অনেক দেশেই জাদুঘর স্মার্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। নিদর্শনের সামনে টাচ করলে নানাভাবে ঘুরিয়ে দেখানো হয়। বিভিন্ন ভাষায় বর্ণনা শোনানো হয়। মোবাইলে স্ক্যান করলে প্রদর্শনটির মূল জায়গার ভিডিও দেখা যায়। বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাচীন সভ্যতায় ভার্চুয়াল ভ্রমণ করা যায়। আমাদের এখানে এসবের কিছুই নেই।’
জাতীয় জাদুঘর সূত্রে জানা গিয়েছে, জাদুঘরটিতে ৯৩ হাজার ৯৩৬টি নিদর্শন রয়েছে। তবে জায়গাস্বল্পতার কারণে মাত্র ৪ হাজার ১৫০টি নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হচ্ছে। বাকি ৮৯ হাজার ৭৮৬টি নিদর্শনই দেখতে পাচ্ছে না দর্শনার্থীরা। মাত্র ৪ শতাংশ নিদর্শন দর্শনার্থীদের দেখানোর সুযোগ রয়েছে জাতীয় জাদুঘরে।
সম্প্রতি জাতীয় জাদুঘরে গিয়ে দেখা গিয়েছে, জাদুঘরটি পূর্বের চারতলাবিশিষ্ট বিল্ডিংয়ে প্রশাসনিক ও প্রদর্শনীর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জাদুঘরে প্রথম তলায় বাংলাদেশের প্রকৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব-সম্পর্কিত নিদর্শনাবলি রয়েছে। ঢোকার পথেই বাংলাদেশের বিশাল মানচিত্র দেখা যায়। তারপর বাম দিক দিয়ে কক্সবাজার, সিলেট চা বাগান ও গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সুন্দরবনের দৃশ্যপট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন শিলা ও খনিজ, প্রাচীন ভাস্কর্য ও প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শনও রয়েছে এ ফ্লোরে। দ্বিতীয় তলায় ইতিহাস ও শিল্পকলার নিদর্শনগুলো রয়েছে। এর মধ্যে সুলতানি ও মোগল আমলের শিল্পকর্ম, প্রাচীন মুদ্রা, অস্ত্রশস্ত্র এবং বিভিন্ন আমলের ভাস্কর্য দেখতে পাওয়া যায়। তৃতীয় তলায় মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন-সম্পর্কিত নিদর্শন রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ আলোকচিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অস্ত্র, বধ্যভূমির নিদর্শন ও ভাষা আন্দোলনের স্মারকগুলো দেখার সুযোগ রয়েছে এখানে। সর্বশেষ চতুর্থ তলা সাজানো হয়েছে বিশ্ব সভ্যতা ও লোকশিল্প নিদর্শন দিয়ে। এখানে বিভিন্ন দেশের শিল্পকর্ম, লোকশিল্প, পোশাক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রদর্শনী রয়েছে। এসব নিদর্শন ছাড়াও জাতীয় জাদুঘরে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং গ্যালারিগুলোতে সংরক্ষিত পশুপাখি ও তিমি মাছের বিশাল কঙ্কালের দেখা মেলে।
দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও দিন দিন দর্শনার্থীরা জাতীয় জাদুঘর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে দাবি করেছেন জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর দেশের ও জাতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে জনগণের আগ্রহ কমে গেছে। গত এক বছরে দর্শনার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির বদলে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিগত কয়েক বছরে নিদর্শন সংগ্রহের সংখ্যা খুব সামান্য। এছাড়া কোনো বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়নি। যেখানে আগে প্রতি মাসে অন্তত একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন হতো। এমনকি অক্টোবরে টাঙ্গাইলের শাড়ি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করলেও তা নিয়ে বিশেষ কোনো প্রদর্শনী বা প্রচারণার উদ্যোগ নেয়া হয়নি।’
জাতীয় জাদুঘর সূত্রে জানা গিয়েছে, জাদুঘরে প্রস্তর যুগের নিদর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বিভিন্ন মডেলের নিদর্শন রয়েছে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন আমলের স্বর্ণমুদ্রা থেকে শুরু করে প্রাচীন সময়ের ধাতব মুদ্রা। বাংলাদেশের জাদুঘরে সংরক্ষিত উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে তালপাতা, গাছের বাকল এবং প্রাচীন পদ্ধতিতে তৈরি কাগজে লিখিত পাণ্ডুলিপি, সনদ, ফরমান, দাপ্তরিক নথিপত্র, বইপত্র, পত্রিকা, মানচিত্র, রেখাচিত্র, চিত্রকর্ম; হাতির দাঁতের তৈরি সিংহাসন, মাদুর, গয়নার বাক্স, খেলনাসামগ্রী; কাঠের তৈরি আসবাব, স্থাপত্যকর্ম, প্রতিমা; বিচিত্র নকশার টেরাকোটা, মৃৎপাত্র; ধাতব পদার্থের তৈরি গৃহস্থালি তৈজসপত্র, বাসনকোসন, মূর্তি-প্রতিমা, মুদ্রা, তলোয়ার, ছুরি, বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, তাম্রপত্র; পাথরের তৈরি হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি, লিপিকলাসংবলিত স্থাপত্যকর্ম, রাজাবাদশাহদের পোশাক, স্বর্ণের গহনা, চামড়ার জুতাসহ বিভিন্ন সামগ্রী।
জাতীয় জাদুঘরের কিপার আসমা ফেরদৌসী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ৯৪ হাজার নিদর্শনের মধ্যে মাত্র চার হাজারের মতো আমরা দেখাতে পারছি। তার মধ্যে আমাদের নিদর্শন উপযোগী সমৃদ্ধ সংগ্রহশালাও প্রয়োজন।’
জাদুঘরটিতে ১৫টি স্টোর রুম রয়েছে। তবে এত বিপুল পরিমাণ নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি নিদর্শন সংগ্রহের জন্য সঠিক পরিবেশও নেই। এ কারণে দুর্লভ সংগ্রহগুলোর আয়ু কমে যাচ্ছে। কোনো কোনোগুলো নষ্টও হচ্ছে। সংগ্রহ নষ্ট হলে সেগুলো অপসারণ করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাদুঘর-সংশ্লিষ্টরা বলেন, বাংলাদেশের চরম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ু জৈব নিদর্শনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব উপকরণের উৎস সেলুলোজ সেগুলো সঠিক মানমাত্রায় সংরক্ষণ করা না হলে ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, কীট-পোকামাকড়, পতঙ্গ ও ছোট প্রাণীর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে এসব উপকরণ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে থাকে।
এছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলে বিরাজমান উচ্চমাত্রার আর্দ্রতা জাদুঘরের ধাতব নিদর্শনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আর্দ্র মৌসুমে লোহা, তামা, সিসা ও মিশ্র ধাতু দিয়ে তৈরি বস্তুতে অক্সিজেনের বিক্রিয়ায় নিদর্শনের ওপর ক্ষয়কারী একটি স্তর তৈরি হয়। এ স্তর ধীরে ধীরে ধাতুর মূল অংশের দিকে অগ্রসর হয় এবং মূল অংশটি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে। এদিকে জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত তালপাতা, গাছের বাকল ও কাগজজাত উপকরণ, পশুচর্মে লিখিত পাণ্ডুলিপি, চামড়া ও কাষ্ঠনির্মিত বস্তুগুলোতেও নানা ধরনের ক্ষয় ও জৈব অবক্ষয় দেখা দেয়। লৌহজাত দ্রব্যে মরিচা ও সাদা কঠিন আবরণ জমে; তামা ও এর মিশ্র ধাতুর বস্তুর ওপর কালো প্রলেপ পড়ে; ব্রোঞ্জ ও পিতলের ওপর ফ্যাকাশে সবুজাভ গুঁড়া দাগ দেখা দেয়; আর রৌপ্যদ্রব্য ধীরে ধীরে নিষ্প্রভ হয়ে যায়।
জাদুঘরের কিপাররা জানান, আসলে কোনো সরকারই জাতীয় জাদুঘরকে আধুনিক বা স্মার্ট জাদুঘরে রূপান্তর করার পদক্ষেপ নেয়নি। আমাদের যে স্টোরগুলো আছে সেগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে নিদর্শন সংগ্রহ করা হয় না। এ কারণে ধীর ধীরে অনেক মূল্যবান নিদর্শন নষ্ট হয়ে গেছে। আবার গ্যালারিতে জায়গা না থাকার কারণে অনেক নিদর্শন প্রদর্শনই করা যায় না।
সার্বিক বিষয়ে জাদুঘরের সচিব সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। গ্যালারির সংকট আছে। স্টোরের সক্ষমতা সীমিত। এর মধ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সরকারকে জাদুঘর নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।’


