এমপিরা বরাদ্দের ৫০% অর্থ নিজের পকেটে ভরেন —রুমিন ফারহানা
জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
ঝিনাইদহে তিন দিনব্যাপী কৃষিপ্রযুক্তি মেলা শুরু
জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
এমপিরা বরাদ্দের ৫০% অর্থ নিজের পকেটে ভরেন —রুমিন ফারহানা
জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
ঝিনাইদহে তিন দিনব্যাপী কৃষিপ্রযুক্তি মেলা শুরু
জানুয়ারি ১৩, ২০২৬

ক্রু ও লোকোমোটিভ সংকটে মাসে বন্ধ থাকছে প্রায় ৬০০ ট্রেন

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রেন চলাচলের সূচি। তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ও যান্ত্রিক অচলাবস্থার ফলে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ সংকট।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন দেড় শতাধিক ট্রেন চলাচলের সূচি। তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ও যান্ত্রিক অচলাবস্থার ফলে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ সংকট। প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকোমোটিভ ও ট্রেন ক্রু (চালক, সহকারী চালক ও গার্ড) না থাকায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬০০টি ট্রেন বাতিল বা আংশিক চলাচল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে যাত্রীসেবার পাশাপাশি রাজস্ব আয়েও বড় ধাক্কা খাচ্ছে রেলওয়ে।

রেলের তথ্যমতে, সদ্য বিদায়ী বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই সর্বনিম্ন ১৪টি থেকে সর্বোচ্চ ২৪টি পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়েকে। লোকোমোটিভ ও প্রয়োজনীয় জনবল সংকটের কারণে এসব ট্রেন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী চালানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ৫৪৬টি, অক্টোবরে ৫৮৯টি ও নভেম্বরে বাতিল করা হয় ৫৭৪টি ট্রেন। রেলওয়ের সর্বশেষ সংযোজিত ওয়ার্কিং টাইম টেবিল (ডব্লিউটিটি-৫৪) অনুযায়ী এসব ট্রেন নির্দিষ্ট রুটে চলাচলের কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা যায়নি। ফলে ট্রেনসংখ্যা অনুযায়ী যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে রেলের হিসাব বিভাগ।

রেলের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে দৈনিক ৫৮টি আন্তঃনগর ট্রেন, ৬০টি কমিউটার ও মেইল ট্রেন এবং ৩৮টি লোকাল ট্রেন চলাচলের কথা। সাপ্তাহিক বন্ধ বাদ দিলে মাসে গড়ে সাড়ে চার হাজার যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের সূচি রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, চাঁদপুরসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটকে সংযুক্ত করতে এসব ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যাত্রী চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রেলের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং কৃষি ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়ক হিসেবেও এসব ট্রেন সার্ভিস বিবেচিত।

রেলওয়ের পরিবহন বিভাগ জানায়, আন্তঃনগর ট্রেনের তুলনায় দ্বিতীয় শ্রেণীর মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেনগুলোই গ্রামীণ ও উপশহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। তবে লোকোমোটিভ ও জনবল সংকটের কারণে ২০২০ সাল থেকে রেলওয়ে ধারাবাহিকভাবে ১৬টি মেইল ও কমিউটার ট্রেন স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ রেখেছে। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে বন্ধ রয়েছে আরো ছয়টি লোকাল ট্রেন।

জানা গেছে, পূর্বাঞ্চল রেলের বিভিন্ন রুটে ২০২০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেন বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে কিছু ট্রেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। আবার কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ লোকাল, মেইল, এক্সপ্রেস ও কমিউটার ট্রেন নিয়মমাফিক পরিচালনার কথা থাকলেও নিয়মিত লোকোমোটিভ ও ক্রু সংকটে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। নিয়মিত পরিচালনা করতে না পারা ট্রেনগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-ময়মনসিংহ-ঢাকা রুটের ঈশাখান মেইল, ময়মনসিংহ-ইব্রাহিমাবাদ-ময়মনসিংহ রুটের ধলেশ্বরী মেইল, ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ বাজার-ঢাকা রুটের ভাওয়াল মেইল, ইব্রাহিমাবাদ-ঢাকা-ইব্রাহিমাবাদ রুটের টাঙ্গাইল কমিউটার, ময়মনসিংহ-দেওয়ানগঞ্জ বাজার-ময়মনসিংহ রুটের লোকাল, মোহনগঞ্জ-ময়মনসিংহ-মোহনগঞ্জ রুটের লোকাল, চট্টগ্রাম-সিলেট-চট্টগ্রাম রুটের জালালাবাদ এক্সপ্রেস, ঢাকা-সিলেট-ঢাকা রুটের সুরমা মেইল, নোয়াখালী-লাকসাম-নোয়াখালী রুটের সমতট মেইল এবং নোয়াখালী-ঢাকা-নোয়াখালী রুটের ঢাকা এক্সপ্রেস ও নোয়াখালী মেইল। পূর্বাঞ্চলের প্রধান কয়েকটি মেট্রোপলিটন ও জেলা শহর থেকে উপজেলা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এসব ট্রেন সার্ভিসের মাধ্যমে যাত্রীরা স্বল্প ও মধ্য দূরত্বে ভ্রমণ করায় দেশের সড়কপথের ওপর চাপ কম ছিল। এখন তাদের ভোগান্তি, বাড়তি ব্যয় ছাড়াও সড়কে দুর্ঘটনা ঝুঁকিসহ বাড়িয়ে তুলেছে যানজট।

ট্রেন অপারেশনে যুক্ত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এসব ট্রেন বন্ধ থাকায় একদিকে রেলের রাজস্ব আয় কমছে, অন্যদিকে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়ে সার্বিক পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে। তারা মনে করছেন, দ্রুত লোকোমোটিভ সংগ্রহ ও জনবল নিয়োগ না হলে পূর্বাঞ্চলে ট্রেন চলাচলের এ সংকট আরো গভীর হতে পারে।

রেলের হিসাব বিভাগের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলের একাধিক শ্রেণীর ট্রেন সার্ভিস ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেনের সংখ্যা কমানো হয়েছে জনবল ও লোকোমোটিভের কারণে। একসময় আন্তঃনগর ট্রেন রেলের সবচেয়ে প্রিমিয়াম সার্ভিস ছিল। এখন অতিরিক্ত যাত্রাবিরতি, স্টপেজে অপেক্ষা ও ভ্রমণ সময় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা আন্তঃনগর ট্রেনকেই “‍লোকাল ট্রেন” নামে ডাকছে। রেলওয়ে সীমিত আকারে পূর্বাঞ্চলে চারটি ট্রেনকে আংশিক বিরতিযুক্ত আকারে চালু করেছে। অন্যান্য আন্তঃনগরের তুলনায় আংশিক বিরতিযুক্ত ট্রেনগুলোয় টিকিটের চাহিদাও সবচেয়ে বেশি।’ ফলে ‘বিরতিহীন’ নামে চলা ট্রেনের কারণে সাধারণ আন্তঃনগর ট্রেনগুলো লোকাল ট্রেনের পথেই হাঁটছে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে দ্রুতগামী ও দীর্ঘ দূরত্বে যাত্রী পরিবহনের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোয় বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অনাকাঙ্ক্ষিত যাত্রাবিরতি দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে দ্বিতীয় শ্রেণীর ট্রেন বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের আন্দোলন, ট্রেন অবরোধ, জনপ্রতিনিধিদের চাপে বিশেষায়িত ট্রেনগুলোকে নিয়ম লঙ্ঘন করে যাত্রাবিরতি দিতে বাধ্য হচ্ছে রেলওয়ে। এতে বাড়তি ভাড়ায় ভ্রমণ করা যাত্রীরা পড়ছেন ভোগান্তিতে।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ৯০ শতাংশের বেশি মিটার গেজ রেলপথ। বর্তমানে সারা দেশের ৬৪টির মধ্যে ৪৯টি জেলা রেলওয়ে নেটওয়ার্কে যুক্ত। পূর্বাঞ্চলে ১৬২টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ থাকলেও ৬৯ শতাংশই অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এছাড়া ১ হাজার ২৬৭টি মিটার গেজ যাত্রীবাহী কোচের মধ্যে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে ৪৩ শতাংশের। দীর্ঘদিন ধরে লোকোমোটিভ সংকটে থাকলেও রেলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতায় রেলওয়ে এ সংকট সমাধান করতে পারছে না। যার কারণে সেবা বাড়ানোর পরিবর্তে ট্রেনসেবা সংকুচিত করতে বাধ্য হয়েছে রেলওয়ে। দেশের প্রধান প্রধান শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহের মতো এলাকায় চলাচল করা প্রতি মাসে ৬০০টির মতো ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় ট্রেনের এ চাপ গিয়ে পড়ছে সড়কপথে। যা সারা দেশের সড়কগুলোয় অত্যধিক যানজট, দুর্ঘটনাসহ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় নৈরাজ্যের জন্য দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেলওয়ে শুধু অত্যধিক লাভের জন্য ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা করে, তা নয়। সরকারি এ প্রতিষ্ঠান রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি সব শ্রেণীর মানুষকে সেবা দেয়ার মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে নিভৃতে অবদান রাখছে। ব্রিটিশ আমল থেকেই রেলের সার্ভিসগুলো ট্রেন সংযোগকারী অঞ্চলগুলোর মানুষকে যুক্ত করেছে পরিবহন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। বিশেষ করে শত বছর আগে যখন সড়ক যোগাযোগ ভালো ছিল না, তখন মানুষ ট্রেনকেই প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। তবে কিছুদিন ধরে রেলওয়ে তীব্র লোকোমোটিভ সংকটে রয়েছে। যার কারণে নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে কিছু ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। রেলের শিডিউলে নাম থাকায় সুযোগ পেলেই এসব ট্রেন সার্ভিস চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে যোগাযোগ প্রদানে রেলওয়ে অবদান রাখবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *