ডাকসু নির্বাচন : যে কোনো মূল্যে শৃঙ্খলা চাই
আগস্ট ২৮, ২০২৫
হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৫
ডাকসু নির্বাচন : যে কোনো মূল্যে শৃঙ্খলা চাই
আগস্ট ২৮, ২০২৫
হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়
সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৫

বিএনপির প্রতিষ্ঠা এবং আজকের রাজনীতি

জাকির হোসেন:
১৯৭১ সালে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় স্বাধীনতাযুদ্ধে নামতে হয়েছে আমাদের। এমনকি স্বাধীনতার ঘোষণাও দিতে পারেনি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। মেজর জিয়া যখন তার পরিবারকে চরম বিপদের ঝুঁকিতে ফেলে স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন, তখন আওয়ামী নেতৃত্ব আত্মসমর্পণ আর পলায়নে ব্যস্ত, কেউবা বিমানে পাকিস্তানের দিকে, কেউবা মেহেরপুরের পথে। আর তরুণ নেতৃত্ব বুড়িগঙ্গার ওপারে মোস্তফা মোহসিন মন্টুর বাসায় জিয়ার বেতার ঘোষণা শুনছেন। ওদিকে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে নিরস্ত্র মানুষের লাশের স্তূপ জমছে দেশের সব প্রান্তে। সংগঠিত হয়ে এদেশের মুক্তিকামী তরুণরা গেরিলা যুদ্ধের পালটা চোরাগুপ্তা আক্রমণ নিয়ে মাঠে আসতে আসতে মে-জুনে গড়িয়েছে। তবে সেই তরুণদের মাঝে আওয়ামী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা ছিল নিছক অপচেষ্টা। তারা তখন জেনারেল উবানের ‘ডিমতত্ত্বের’ বাস্তবায়নে নৈনিতাল, দেরাদুনের নাতিশীতোষ্ণ পাহাড়ে প্রশিক্ষণরত। বাংলাদেশে পথেপ্রান্তরে যুদ্ধ করেছে দেশের সাধারণ ছাত্র-শ্রমিক কৃষক এরাই। তারপরও সবকিছু ভুলে শুধু স্বাধীনতার আকর্ষণে দেশের মানুষের অবিশ্বাস্য ঐক্যই সম্ভব করেছে ডিসেম্বরের বিজয়।

ডিসেম্বরে বিজয়ের মুহূর্তে ইতিহাসের সর্বাধিক ঐক্যকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলো আওয়ামী নেতৃত্ব। তারা উড়ে এসে হঠাৎই স্বাধীনতার একমাত্র দাবিদার হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার সুযোগ হেলায় হারালেন-বিজয়ের শুরুতেই এলো বিভক্তি। এমন স্বাধীনতা চাইনি বলে আওয়ামী লীগেরই একাংশ বিভক্তিতে গড়ল ‘জাসদ’ আবদুর রব আর শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে-তথাকথিত ‘মাস্টারমাইন্ড’ সিরাজুল আলম খান নতুনভাবে এই বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহীদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হয়ে আবির্ভূত হলেন। অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা হওয়ার অমূল্য সুযোগ হারালেন শেখ মুজিব। একবার রাষ্ট্রপতি আরেকবার প্রধানমন্ত্রী, তারপর আবার রাষ্ট্রপতির পদের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকল তার নাম। বিধ্বস্ত বাংলাদেশ তখন এক চরম নৈরাজ্যের অভয়ারণ্য-দেশের মানুষ পাকিস্তানের ফুটন্ত কড়াই থেকে আওয়ামী লীগের জ্বলন্ত আগুনে পতিত হলো। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, অভাব আর দুর্ভিক্ষ-রাস্তায় রাস্তায় অনাহারে মৃত লাশের সারি। জনতাকে স্তব্ধ করতে মাঠে নামল কুখ্যাত ‘রক্ষীবাহিনী’ নামের এক আতঙ্ক, তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো সম্ভাবনাময় তারুণ্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। অসহিষ্ণু সরকার কোনো প্রতিবাদই সহ্য করতে পারছিল না, ভিয়েতনামে যুদ্ধ অবসানের দাবিতে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে গুলিতে নিহত হলো দুজন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির উদ্দেশে জাসদের মিছিল পরিণত হলো লাশের মিছিলে। অরাজকতার কফিনে শেষ পেরেক হয়ে এলো ১৯৭৫-এর জানুয়ারিতে একদলীয় ‘বাকশাল’। নিষিদ্ধ হলো সব রাজনৈতিক দল-কণ্ঠরোধ হলো সংবাদপত্রের বিনা জবাবদিহিতায় সংসদের মেয়াদ বেড়ে গেল পাঁচ বছর-অবশ্য এর আগে ’৭৩-এর সংসদ নির্বাচনে ব্যালট চুরির মহোৎসব দেখার সৌভাগ্য হয়েছে দেশবাসীর। এলো আগস্ট ১৯৭৫, সপরিবারে নিহত হলেন শেখ মুজিব, ক্ষমতায় এলো তারই বিশ্বস্ত সহযোগী খন্দকার মোশতাক, সংসদের স্পিকার মালেক উকিল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, ‘দেশ ফেরাউন মুক্ত হয়েছে।’ ইতিহাস আসলেই বড় নির্মম। আগস্ট পরবর্তীকালে সেনাবাহিনীতে যখন বিশৃঙ্খলা, তখন অভ্যুত্থান আর পালটা অভ্যুত্থান হলো নিত্যসঙ্গী। দেশপ্রেমিক সাধারণ সৈনিক এমন অরাজকতার মাঝে ঘটাল এক দায়িত্বশীল বিপ্লব। ৭ নভেম্বরে সংঘটিত হলো এক ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লব-রাষ্ট্রের পাদপ্রদীপে আবারও এলেন জিয়াউর রহমান, জাতির মুক্তির দূত হয়ে। দায়িত্ব পালনের সংক্ষিপ্ত সময়ের মাঝেই ঘটালেন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। দুর্ভিক্ষের বাংলাদেশ পরিণত হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে, মুক্ত হলো অবরুদ্ধ সংবাদপত্র, অবারিত হলো রাজনৈতিক চর্চা। দেশের মানুষের প্রত্যশা ছিল এমন একটি রাজনৈতিক দলের, যারা আদর্শে হবে উদার মধ্যপন্থি, দৃঢ় থাকবে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে, মর্যাদা দেবে ধর্মীয় বিশ্বাসকে, ঐক্যবদ্ধ করবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সব মানুষকে, মর্যাদা দেবে নারীদের, কর্মসংস্থান করবে যুবকদের, সমমর্যাদার সম্পর্ক থাকবে সব রাষ্ট্রের সঙ্গে, অগ্রাধিকার পাবে যোগ্যতা আর দেশপ্রেম, শূন্য সহনশীলতা থাকবে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রশ্নে। জিয়া জনপ্রত্যাশাকে অসম্মান করেননি-গড়েছেন তাদেরই প্রত্যাশার দল ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় ঐতিহাসিকভাবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বিশ্বাসী দল হিসাবে যে দল সব মতাদর্শের মানুষকেই ধারণ করতে পারে। তিনি শুধু বিএনপিই প্রতিষ্ঠা করেননি, একই সঙ্গে শেখ মুজিবের হাতে মৃত আওয়ামী লীগেরও পুনর্জন্ম দিয়েছেন। তারপর ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বিএনপির নেতৃত্বে এদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, উৎপাদন সব ক্ষেত্রেই এসেছে অপ্রত্যাশিত সাফল্য, প্রবর্তিত হয়েছে স্বাধীনতা-একুশে পদক, নির্মিত হয়েছে জাতীয় স্মৃতিসৌধ-তারপরও মুক্তিযোদ্ধার দল বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র দাবিদার হয়ে ওঠেনি; যেমনভাবে সংবিধানে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম যুক্ত করেও বিএনপি, এদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ধর্মের নামে ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সস্তা পথে হাঁটেনি। জিয়া শহীদের মর্যাদায় ইন্তেকাল করেছেন-জনগণ তাকে অন্তিমবিদায় জানিয়েছে সর্ববৃহৎ জানাজার মাধ্যমে।

পরবর্তীকালে খালেদা জিয়া দলের দায়িত্ব নিয়েছেন এক কঠিন সময়ে-দলকে করেছেন সুসংহত, স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিলেন সম্মুখ নেতৃত্বে আপসহীন ইমেজে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়-তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে, সব আসনেই বিজয়ী হওয়ার এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। শিকার হয়েছেন এক-এগারোর ষড়যন্ত্রের; কারাবরণ করেছেন মিথ্যা মামলায়, নির্জন কারাগারে আক্রান্ত হয়েছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে। তারপরও পরম সহিষ্ণুতা আর সংযম তাকে আজ দেশ নেত্রীর চেয়েও উচ্চতর আসনে বসিয়েছে। আজ তিনি কোনো দলের নন-আজ তিনি এ দেশের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি, সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে দেশের মানুষের বিশ্বাস আর আস্থার অভিভাবক।

কারারুদ্ধ হওয়ার পর বিএনপির শীর্ষ দায়িত্বে আসেন তারেক রহমান। এক-এগারোর ষড়যন্ত্রকারীদের রোষানলে নির্যাতনের তীব্রতায় প্রায় পঙ্গুত্বকে জয় করে আট হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও দলকে পরিচালিত করছেন পরম দক্ষতায়-যার ফলে গত সতেরো বছরের নির্যাতন, হত্যা, গুম, জেল, মামলায় জর্জরিত হয়েছে লক্ষ-কোটি নেতাকর্মী-সমর্থকরা পরিচয় দিয়েছেন এক অবিশ্বাস্য ঐক্য আর আনুগত্যের-শত নির্যাতনেও তারা ছিলেন অনড়, একজনও আদর্শচ্যুত হয়ে দলত্যাগ করেননি। সতেরো বছর ধরে উত্তপ্ত প্রতিবাদের লাভা মহাবিস্ফোরণে উদ্গীরিত হয়েছে চব্বিশের আগস্টে এক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানে।

জাকির হোসেন, সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম

Old
Old

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *