
ইরানের সঙ্গে চুক্তির প্রত্যাশা ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
মে ৬, ২০২৬একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুসম্পর্কের (সিভিল-মিলিটারি রিলেশন) ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামছুল ইসলাম।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘যে রাষ্ট্রের সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কে ফাটল থাকে, সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থা কখনো স্থায়ী হয় না।’
গতকাল রাজধানীতে আয়োজিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রধানরা, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং প্রতিরক্ষা সচিব উপস্থিত ছিলেন।
ডিসিদের উদ্দেশে দেয়া দীর্ঘ বক্তব্যে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বর্তমান সরকারের প্রতিরক্ষা নীতি, জাতীয় নিরাপত্তার বহুমুখী রূপ এবং বিগত স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেন।
১৯৭১ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রার কথা স্মরণ করে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনী এ দেশের জনগণেরই বাহিনী। ঘূর্ণিঝড় বা অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বেসামরিক প্রশাসনের ওপর আস্থা রেখে একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করেছে।’
নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন আর শুধু ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা প্রচলিত যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘সাইবার হামলা, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারী, তথ্যযুদ্ধ এবং অর্থনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মতো বহুমাত্রিক হুমকি এখন আমাদের নিরাপত্তার বড় অংশ।’
বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেয়া কিছু পশ্চিমা বা বিদেশী পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘টেররিজম, এক্সট্রিমিজম বা র্যাডিকালিজমের মতো শব্দগুলো বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যায় না। বাংলাদেশ একটি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ, যেখানে এক গ্রামে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে। তাই এ শব্দগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে সাবধানতা অবলম্বনের অনুরোধ করছি।’
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ‘ইউনিফর্ম পরিহিত নাগরিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের প্রতি বেসামরিক পরিমণ্ডলে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানান উপদেষ্টা। তিনি ডিসিদের উদ্দেশে বলেন, ‘সৈনিকরা সমাজের স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে কঠোর শৃঙ্খলার জীবন বেছে নেন। আপনারা আপনাদের অবস্থান থেকে তাদের প্রতি সংবেদনশীল হলে এবং তাদের কাজগুলো নিয়মের মধ্যে থেকে সহজ করে দিলে তারা সম্মানিত বোধ করবেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই ইতিবাচক হবে।’
ড. শামছুল ইসলাম বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে আমাদের বাহিনীগুলোকে ধ্বংস করেছে, আমরা তার উল্টো পথে হাঁটব। এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের দুর্নীতিবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি ডিসিদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘যদি নিজের স্বার্থ, দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন, তবে আপনারা আমাদের সহযাত্রী হতে পারবেন না।’
এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর মূল দর্শন—‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি ধারণ করে একটি বিভাজনমুক্ত, ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান সফল ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের যেকোনো সংকটে সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। সিভিল প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা আরো সুদৃঢ় হয়েছে।’ নৌবাহিনীপ্রধান উপকূলীয় ও সমুদ্রসীমা রক্ষায় নৌবাহিনীর কার্যক্রম তুলে ধরেন। বিমানবাহিনী প্রধান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নতুন বিমান সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার তার বক্তব্যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকর নেতৃত্বের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে দেশের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে কাজ করছে।’ প্রতিরক্ষা সচিব জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সশস্ত্র বাহিনীর সব কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুসংহত করতে তাদের অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে সামরিক নেতৃত্ব ও সিভিল প্রশাসনের শক্তিশালী উপস্থিতি এবং পারস্পরিক সমন্বয় ভবিষ্যতে আরো কার্যকর সহযোগিতা জোরদার করবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে এ সমন্বিত প্রয়াস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গতকাল ডিসি সম্মেলনের একটি কার্য-অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের নির্বাচন দেশটির ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’ বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই আসুক না কেন, বাংলাদেশের ফরেন পলিসি পরিবর্তন হবে না বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন, ভারতের নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বাংলাদেশের ফরেন পলিসি অ্যাক্রস দ্য বোর্ড একই থাকবে। আমাদের “বাংলাদেশ প্রথম” বা “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতিতে আমাদের ফরেন পলিসি। সেটা যে সরকারই আসুক না কেন, আমাদের ফরেন পলিসি পরিবর্তন হবে না। আমরা আমাদের ফরেন পলিসি নিয়েই সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এগোব।’
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ পাঁচ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার জন্য অফিসের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ডিসি সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত কার্য-অধিবেশন শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ‘অতি দ্রুত সোলারের মাধ্যমে আমাদের পাঁচ বছরে মিনিমাম ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান আছে। সেটা বাস্তবায়নের জন্য ডিসি সাহেবদের প্রত্যেকটা অফিসে এবং জেলার প্রত্যেকটা অফিসের রুফটপে (ছাদে সোলার প্যানেল) লাগানোর জন্য বলা হয়েছে।’
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সম্পর্কিত কার্য-অধিবেশনে সমাজের জন্য ক্ষতিকর ওয়েবসাইটগুলো ব্লক করার কার্যক্রম জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্কিং নিশ্চিতকরণ ও নেটওয়ার্কের গতি উন্নীতকরণের বিষয়ে আলোচনা হয়।


