বিমানের বহরে যোগ হচ্ছে আরো ১১ বোয়িং বাংলাদেশকে সার্জিও গোরের অভিনন্দন
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ২০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন এডিবির
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
বিমানের বহরে যোগ হচ্ছে আরো ১১ বোয়িং বাংলাদেশকে সার্জিও গোরের অভিনন্দন
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬
দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ২০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন এডিবির
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

রোহিঙ্গা-সংক্রান্ত উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ৫ প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ চায় রোহিঙ্গারা মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাক

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, মর্যাদার সঙ্গে এবং তাদের অধিকার সুরক্ষিত রেখে মিয়ানমারে নিজ ঘরে ফিরে যাক। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে গতকাল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আয়োজিত ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: আ রিনিউড কল ফর আ ডিউরেবল সলিউশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠকে প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বাংলাদেশ মানবিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সালে এবং ১৯৮০-এর দশকজুড়ে বাংলাদেশে কয়েক দফা রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে রোহিঙ্গাদের সফলতার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর সামগ্রিক পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ বিশাল মানবিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে। আমরা ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছি। দুঃখজনকভাবে মিয়ানমারে সহিংসতার কারণে এখনো অনেকে পালিয়ে আসছে। প্রতি বছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে এ দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি প্রজন্ম। তরুণরা অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে। আর প্রবীণরা যে ঘরবাড়ি ও গ্রাম ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন, সেসবের স্মৃতি বুকে নিয়ে সেখানে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছেন।’
মানবিকতার তাগিদেই বাংলাদেশ তার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শিবিরগুলোয় রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। প্রায় ছয় হাজার লার্নিং সেন্টারের মাধ্যমে তাদের শিশুরা মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা পাচ্ছে। রোহিঙ্গা তরুণদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভবিষ্যতে তাদের পুনঃএকীভূত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হবে। শিবিরগুলোর পরিস্থিতি উন্নত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি; তবে দীর্ঘ সময় বসবাসের জন্য এগুলো কোনো আদর্শ স্থান নয়।’
বাংলাদেশের ওপর সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ এখন বিপুল বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও হতাশা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে মানব পাচার, মাদক পাচার এবং অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ। কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন। একটি দেশে অমীমাংসিত থেকে যাওয়া সংকট পুরো অঞ্চলের জন্য নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘প্রয়োজন যত বাড়ছে, মানবিক সহায়তা ততই সংকুচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের আওতায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তার আবেদন জানানো হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য যা প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়, শুধু ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর জন্য।’
বাংলাদেশের পাশে অব্যাহতভাবে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তাদের সহায়তা বেশি প্রয়োজন। তবে মানবিক সহায়তার উদারতা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না। একইভাবে অনির্দিষ্টকাল ধরে এ দায়িত্ব কেবল বাংলাদেশই বহন করবে—এমন প্রত্যাশাও করা যায় না।’
এ সংকটের উৎপত্তির মতো এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনো গভীরভাবে উদ্বেগজনক। রোহিঙ্গারা এখনো জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রম এবং অন্যান্য ধরনের নিরাপত্তাহীনতাসহ গুরুতর লঙ্ঘন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো নিশ্চিত হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও তার সমাধান খোঁজার পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে; প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপে যাওয়ার সময় এসেছে; এ বাস্তুচ্যুতির অবসান ঘটানোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।’
এ প্রেক্ষাপটে পাঁচটি ক্ষেত্রে কিছু জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব রাখেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসইভাবে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও অন্যান্য রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে হবে এবং তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা ফিরে পায়। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও সহায়তা করতে হবে। চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টায় গাম্বিয়ার নেতৃত্বের জন্য আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও স্বীকার করি, যেখানে ব্যক্তিগত অপরাধের দায় নির্ধারণের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাও কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে অব্যাহত সহায়তা দিতে হবে। গুরুতর অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
পঞ্চমত, এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা উসকে দেয়া মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানব পাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবেলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো জোরদার করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় গতকাল দুপুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক।
তিনি জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। দুই প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যান। নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থলে গতকাল সকালে উচ্চ পর্যায়ের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তাদের মধ্যে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি, সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আন্তর্জাতিক দাতব্য, জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন তারেক রহমান। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর মধ্যে গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কাছে ৮২১ ইউনাইটেড নেশনস প্লাজায় অবস্থিত তুর্কি হাউজে এ বৈঠক হয়। এ সময় দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করে পারস্পরিক স্বার্থ ও অভিন্ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *