চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তি স্থাপন ৩০ আগস্ট
আগস্ট ১৩, ২০২৬
শিক্ষক থেকে ‘মহামান্যে’র পথে মির্জা ফখরুল
আগস্ট ১৩, ২০২৬
চট্টগ্রামের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তি স্থাপন ৩০ আগস্ট
আগস্ট ১৩, ২০২৬
শিক্ষক থেকে ‘মহামান্যে’র পথে মির্জা ফখরুল
আগস্ট ১৩, ২০২৬

ডেটা সেন্টার বানাতে হলে তা কঠোর পরিবেশগত শর্ত মেনে হওয়াই কাম্য

একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, তা দিয়ে একটি ছোট শহরের ৩০-৫০ হাজার মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব। গুগলের ২০২৩ সালের পরিবেশ প্রতিবেদন বলছে, শুধু ২০২২ সালেই তাদের ডেটা সেন্টারগুলো ব্যবহার করেছে ৫৬০ কোটি গ্যালন পানি। মাইক্রোসফটের পানি ব্যবহার বেড়েছে ৩৪ শতাংশ।

বাংলাদেশে ‘ডেটা সেন্টার’ শব্দটি সম্প্রতি উন্নয়নের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়তে হলে ডেটা সেন্টার লাগবে, ডিজিটাল অর্থনীতিকে সামনে নিয়ে যেতে হলে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের জন্য সার্ভার ফার্ম তৈরি করতে হবে—এমনটাই যেন স্থির সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যখন ইউটিউবে ভিডিও দেখি, জিমেইলে মেইল করি, বা এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে প্রশ্ন করি, তখন সেই তথ্য বাতাসে মিলিয়ে যায় না; এটি জমা হয় পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তের একটি বিশাল ভবনের ভেতরের হাজার হাজার কম্পিউটার সার্ভারে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশের মতো একটি জনবহুল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশে নিজস্ব ডেটা সেন্টার থাকা উচিত কিনা?

আপাতদৃষ্টিতে ডেটা সেন্টার থাকা উচিত মনে হতে পারে। কারণ নিজস্ব ডেটা সেন্টার থাকলে ডেটা সার্বভৌমত্ব বজায় থাকে, বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমে এবং তৈরি হয় প্রযুক্তিগত দক্ষ কর্মসংস্থান। এটি যেন আধুনিক যুগের একটি মোহনীয় স্বপ্ন। কিন্তু এ স্বপ্নের মোহমুক্তির জন্য আমাদের তাকাতে হবে পশ্চিমের উন্নত বিশ্বের দিকে, যেখানে এ ডেটা সেন্টারগুলো পরিবেশের জন্য কী ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে গত বছর স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছেন। প্লাকার্ডে লেখা—আমাদের পানি ফেরত চাই। আন্দোলনকারীদের কেউ প্রযুক্তিবিদ, কেউ গৃহিণী, কেউ কৃষক। সবার অভিযোগ একটাই—গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজনের ডেটা সেন্টারগুলো তাদের এলাকার পুরো পানির ভাণ্ডার শুষে নিচ্ছে।

বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ইন্টারনেট ট্রাফিক যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া রাজ্যের ডেটা সেন্টারগুলোর মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ভার্জিনিয়া ইনডিপেনডেন্ট জানায়, স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতার মুখে একের পর এক ডেটা সেন্টার প্রকল্প বাতিল হচ্ছে। একসময় যেসব এলাকা ডেটা সেন্টারকে স্বাগত জানাত, সেসব এলাকার বাসিন্দারাই এখন রাস্তায় নেমে এসেছেন তীব্র বিরোধিতা নিয়ে।

এ দৃশ্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা আয়ারল্যান্ডের নয়। চিলি, উরুগুয়ে, নেদারল্যান্ডস সব জায়গায় একই গল্প। যেখানেই বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ডেটা সেন্টার বসিয়েছে, সেখানেই স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বেধেছে। কারণটা সহজ—ডেটা সেন্টারের তাপ নিয়ন্ত্রণে (কুলিং সিস্টেম) ব্যাপক পানি প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ এখন ডেটা সেন্টার নির্মাণের স্বপ্ন দেখছে। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ চলছে। শোনা যাচ্ছে, দেশীয় প্রযুক্তি খাতকে শক্তিশালী করতে একাধিক বড় ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা আছে।

এখন যে প্রশ্নটা আমাদের করতে হবে সেটি হলো যে দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর দুই-তিন মিটার করে নিচে নামছে, যে দেশের নদীগুলো শুকিয়ে খাল হয়ে যাচ্ছে, সেই দেশ কি ডেটা সেন্টার পরিচালনার উপযোগী?

ক্লাউড নামের কালো বাক্স

আমরা যাকে ক্লাউড বলি, সেটা আসলে মাটিতে বসানো বিশাল বিশাল সব সার্ভার রুম। আপনার ফেসবুক স্ক্রল, চ্যাটজিপিটির উত্তর, ইউটিউবের গান, অফিসের জুম মিটিং—সব প্রক্রিয়া হয় এ সার্ভার রুমে। সার্ভারগুলো চলতে থাকে বিরতিহীনভাবে।

সমস্যাটা হলো, এতক্ষণ চলার ফলে সার্ভারগুলো ভীষণ গরম হয়ে ওঠে। এ তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সার্ভার পুড়ে যাবে। তাই প্রয়োজন পড়ে কুলিং সিস্টেমের। বেশির ভাগ ডাটা সেন্টারে এ কুলিং হয় পানির মাধ্যমে—ইভাপোরেটিভ কুলিং নামের এক প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তিটা মোটামুটি এ রকম: গরম বাতাসকে পানির মধ্য দিয়ে চালনা করা হয়, পানি বাষ্পীভূত হয়ে বাতাস ঠাণ্ডা করে। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় যে পানি বাষ্প হয়ে যায়, সেটা আর ফেরত আসে না।

একটি মাঝারি আকারের ডেটা সেন্টার প্রতিদিন যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করে, তা দিয়ে একটি ছোট শহরের ৩০-৫০ হাজার মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব। গুগলের ২০২৩ সালের পরিবেশ প্রতিবেদন বলছে, শুধু ২০২২ সালেই তাদের ডেটা সেন্টারগুলো ব্যবহার করেছে ৫৬০ কোটি গ্যালন পানি। মাইক্রোসফটের পানি ব্যবহার বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। গবেষকরা হিসাব করে দেখেছেন, চ্যাটজিপিটিকে ২০ থেকে ৫০টি প্রশ্ন করলেই যে বিদ্যুৎ আর পানি খরচ হয়, তাতে একটি আধা লিটারের পানির বোতল ফুরিয়ে যায়।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, অধিক ঘনত্বের ডেটা সেন্টারগুলোর কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে পানিভিত্তিক কুলিং অপরিহার্য। ২২ শতাংশ ডাটা সেন্টার পানিভিত্তিক কুলিং সিস্টেম ব্যবহার করে। বেশির ভাগ ডেটা সেন্টার বছরে এক কোটি গ্যালনের বেশি পানি ব্যবহার করে; কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ ব্যবহার বছরে ১০ কোটি গ্যালনও ছাড়িয়ে যায়।

ভাবুন তো, আপনি কৌতূহলবশত এআইকে পাঁচটি প্রশ্ন করলেন—আপনার অজান্তেই শেষ হয়ে গেল এক গ্লাস পানি।

বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির বাস্তবতা

বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত দুই দশকে ভয়ংকরভাবে নেমে গেছে। ঢাকার কোথাও কোথাও পানির স্তর নেমেছে ৬০ মিটারের নিচে। শুধু ঢাকা না—উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমি, মধ্যাঞ্চলের মধুপুর গড়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা-সাতক্ষীরা—সবখানে একই চিত্র। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের হিসাবে, দেশের অনেক এলাকায় বছরে দুই-তিন মিটার করে পানি নেমে যাচ্ছে।

অন্যদিকে আমাদের নদীগুলোর অবস্থা আরো করুণ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ছাড়া বেশির ভাগ ছোট-মাঝারি নদী হয় মরে গেছে, নয়তো মরার পথে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা—এ নদীগুলো যে শুধু দূষিত তা নয়, এগুলোর নাব্যতাও কমে গেছে ভয়ংকর রকম। শুকনো মৌসুমে অধিকাংশ নদীতে পানি থাকে না বললেই চলে।

এখন এ বাস্তবতায় যদি আমরা ঢাকা বা গাজীপুরে একটি বড় ডেটা সেন্টার বসাই, সেটি প্রতিদিন যে ৩০-৫০ লাখ লিটার পানি টেনে নেবে, তা কোত্থেকে আসবে? ভূগর্ভ থেকে। ফলাফলটা কী দাঁড়াবে? এরই মধ্যে যেখানে পানির স্তর বিপজ্জনক হারে নামছে, সেখানে এ অতিরিক্ত চাপ পুরো ইকোসিস্টেমকে ধসিয়ে দিতে পারে।

একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার—ডেটা সেন্টার যে পানি ব্যবহার করে, তার পুরোটাই কি ভূগর্ভস্থ? পুরোটা না। কোম্পানিগুলো বলবে, আমরা তো মিউনিসিপ্যাল পানিও ব্যবহার করি। কিন্তু বাংলাদেশের শহরগুলোর মিউনিসিপ্যাল পানির সিংহভাগই আসে ভূগর্ভ থেকে। ঢাকা ওয়াসার ৭৮ শতাংশ পানিই আসে গভীর নলকূপ থেকে। সুতরাং উৎস যেটাই হোক, চাপটা পড়ছে ভূগর্ভেই।
শুধু পানি না, কার্বনও

পরিবেশের ওপর ডেটা সেন্টারের প্রভাব পানি দিয়েই শেষ হয় না। ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য বিদ্যুৎও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বের মোট বিদ্যুতের ১ থেকে ১ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যবহার করেছে ডেটা সেন্টারগুলো। ২০২৬ সালের মধ্যে এ হার ২ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

আয়ারল্যান্ডের উদাহরণটা উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে সে দেশের মোট বিদ্যুতের ১৮ শতাংশ খরচ করেছে ডেটা সেন্টার। ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার ৩০ শতাংশে পৌঁছতে পারে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিংহভাগই এখনো জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর—গ্যাস, কয়লা, ডিজেল। সৌরবিদ্যুৎ সামান্যই। কাজেই একটি বড় ডেটা সেন্টার চালু হলে তার কার্বন ফুটপ্রিন্ট হবে সুবিশাল। বায়ুদূষণ বাড়বে, গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও আমরা নিজেরাই সেই সংকট আরো গভীর করব।

আরেকটা বিষয় আছে—ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-ওয়েস্ট। ডেটা সেন্টারের সার্ভার, ব্যাটারি, কেবল—এগুলোর গড় আয়ু তিন থেকে পাঁচ বছর। এরপর এগুলো বর্জ্যে পরিণত হয়। বাংলাদেশে ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার যে করুণ অবস্থা—খোলা আকাশের নিচে পোড়ানো, শিশুশ্রম দিয়ে ভাঙানো—তাতে এ বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।

পৃথিবীজুড়ে প্রতিরোধের দেয়াল

বাংলাদেশে কেউ কেউ যখন ডেটা সেন্টার নিয়ে উচ্ছ্বসিত, তখন পৃথিবীর বহু দেশ কিন্তু থমকে দাঁড়িয়েছে। সিঙ্গাপুর ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। কারণ? জমি ও বিদ্যুতের ওপর প্রচণ্ড চাপ। পরে তারা শর্তসাপেক্ষে নতুন অনুমোদন দিতে শুরু করে—সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পানির পুনর্ব্যবহার—এসব বাধ্যতামূলক করে।

নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ও হাগ অঞ্চলে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় সরকার। কারণ বিদ্যুৎ গ্রিড আর সামলাতে পারছিল না। আয়ারল্যান্ডের জাতীয় জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৮ সালের পর নতুন কোনো ডেটা সেন্টারকে গ্রিড সংযোগ দেয়া হবে না, যদি না তারা নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করে।

চিলিতে গুগলের একটি ডেটা সেন্টার প্রকল্প আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। প্রকল্পটি যে এলাকায় বসছে, সেটা চরম খরাপ্রবণ। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ডেটা সেন্টার তাদের সেচের পানির উৎস শুকিয়ে ফেলবে। আদালত প্রকল্পটির অনুমোদন স্থগিত রেখেছেন।

উরুগুয়েতেও একই ঘটনা। গুগলের ডেটা সেন্টার নিয়ে স্থানীয় জনগণের বিক্ষোভ এতটাই তীব্র হয় যে প্রশাসন পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এসব দেশ কিন্তু প্রযুক্তিবিমুখ কোনো দেশ না। বরং সিঙ্গাপুর, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস—এরা প্রযুক্তিবান্ধব দেশ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু তারা বুঝতে পেরেছে, উচ্চমূল্য যদি পরিবেশের ওপর দিয়ে যায়, তাহলে এ উন্নয়ন টেকসই হবে না।

তাহলে কি কোনো পথ নেই?

এমন না যে ডেটা সেন্টার একেবারেই বাতিল করে দিতে হবে। ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই বিপ্লব, ক্লাউড কম্পিউটিং—এসব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার বিলাসিতা বাংলাদেশের নেই। প্রশ্নটা হলো কীভাবে করতে হবে?

প্রথমত, কুলিং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রথাগত ইভাপোরেটিভ কুলিংয়ের বদলে লিকুইড ইমার্শন কুলিং বা ডিরেক্ট-টু-চিপ কুলিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে পানির ব্যবহার ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। গুগল ও মাইক্রোসফট এরই মধ্যে এ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় ডেটা সেন্টার স্থাপন করে সমুদ্রের পানি দিয়ে কুলিং করা যেতে পারে—যেমনটা করছে ফিনল্যান্ড ও জাপানের কিছু প্রকল্প। চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারের কাছে সমুদ্রসংলগ্ন এলাকায় পরিবেশবান্ধব ডেটা সেন্টার গড়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ—এসবের সঙ্গে ডেটা সেন্টারকে যুক্ত করতে হবে প্রথম দিন থেকেই। শুধু গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর ভরসা করে চলবে না।

চতুর্থত, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা জরুরি। ডেটা সেন্টার কোম্পানিগুলোকে তাদের পানি ব্যবহার, বিদ্যুৎ খরচ ও কার্বন নিঃসরণের তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য করতে হবে। আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস এ পথেই হাঁটছে।

পঞ্চমত, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনো বড় প্রকল্পই টেকসই হবে না। ডেটা সেন্টার তৈরির আগে সেই এলাকার মানুষের মতামত নিতে হবে, তাদের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে স্বাধীন জরিপ করাতে হবে এবং প্রকল্প অনুমোদনের আগে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

ষষ্ঠত, ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে ভূ-উপরিস্থ পানির উৎসের দিকে নজর দিতে হবে। নদীর পানি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ—এসব বিকল্প খতিয়ে দেখতে হবে। সিঙ্গাপুরের ডেটা সেন্টারগুলো এরই মধ্যে নিউ ওয়াটার (পরিশোধিত বর্জ্য পানি) ব্যবহার শুরু করেছে।

সবশেষে, সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ছাড়া কোনো ডেটা সেন্টার প্রকল্পই অনুমোদন দেয়া উচিত হবে না।

শেষ করি আয়ারল্যান্ডের সেই ছবিতেই ফিরে গিয়ে। ডাবলিনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের প্লাকার্ডে শুধু অভিযোগ লেখা ছিল না, ছিল একটা প্রশ্নও—কার জন্য এ মূল্য?”

বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন দরকার, তাতে সন্দেহ নেই। ডিজিটাল অর্থনীতির স্বপ্ন দেখা দরকার। কিন্তু এ স্বপ্নপূরণের পথে যদি আমাদের নদী-নালা, ভূগর্ভস্থ পানি, কৃষিজমি এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনধারণের প্রাকৃতিক উৎসগুলো ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের দামটা কি একটু বেশিই হয়ে গেল না? স্ক্রিনের ওপারে এক ক্লিকে পাওয়া তথ্য বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তর আমাদের কাছে যতটাই জাদুকরী মনে হোক না কেন, তার পেছনে থাকা বস্তুগত সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা চালু থাকুক, কিন্তু তা যেন আসে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। ডেটা সেন্টার যদি বানাতেই হয়, তবে তা প্রকৃতির সঙ্গে আপস না করে, কঠোর পরিবেশগত শর্ত মেনে হওয়াই কাম্য। পানির ফোঁটা যেমন অমূল্য, তেমনি অমূল্য আমাদের অস্তিত্ব। কোনোটিকেই হারানোর বিলাসিতা আমাদের নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *