
জুলাই শহীদ দিবস আজ
জুলাই ১৬, ২০২৬
এআই যুগে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক
জুলাই ১৭, ২০২৬বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত গত তিন দশকে গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস এবং টিকাদান কর্মসূচির মতো ক্ষেত্রে স্বীকৃতি অর্জন করলেও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশেরও বেশি জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা প্রতি বছর অসংখ্য পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন জিডিপির মাত্র দশমিক ৬ থেকে দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম নিম্ন পর্যায়ের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত।
অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও বহু মৌলিক প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান ছিল। দেশে প্রাথমিক পর্যায়েই মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার একটি সমন্বিত জাতীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি। গ্রাম ও শহরের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য, শহুরে স্বাস্থ্যসেবায় দ্বৈত প্রশাসনিক কাঠামো, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং স্বাস্থ্য কার্ডভিত্তিক রোগী ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেকে সরাসরি ঢাকা কিংবা অন্য কোনো বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে চলে যেতে বাধ্য হন। ফলে বড় হাসপাতালগুলো অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত রোগীর চাপে পড়ে, অপেক্ষার সময় বাড়ে এবং সেবার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যশিক্ষা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার প্রতি দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেয়ায় উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারসহ অসংক্রামক রোগ দ্রুত বেড়েছে।
মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মানবসম্পদও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর দীর্ঘদিনের ঘাটতির পাশাপাশি তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মান, দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। এর সঙ্গে হাসপাতালের নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সহিংসতা ও চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
এ বাস্তব প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে যে ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে, তা কেবল তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নয়; বরং একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক, মানসম্মত, প্রযুক্তিনির্ভর, জবাবদিহিমূলক এবং ভবিষ্যৎমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপনের সূচনা।
হাম-রুবেলার টিকা: গত কয়েক মাসে বিএনপি সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে দেশের ইতিহাসে দ্রুততম ও সর্বাধিক সমন্বিত হামের জরুরি টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালনকালে নিয়মিত হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে দেশে উদ্বেগজনকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং অনেক শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি ও অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে সারা দেশে ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান অভিযান পরিচালনা করে। মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে প্রায় শতভাগ কভারেজ অর্জন করা সম্ভব হয়। ফলে হামের প্রাদুর্ভাব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং অসংখ্য শিশুর জীবন রক্ষা পায়। এটি বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন এবং কার্যকর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দক্ষ বাস্তবায়নের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
স্বাস্থ্যে অর্থায়ন: স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বহু বছর ধরে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির মাত্র দশমিক ৬ থেকে দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন সরকার সে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ১ দশমিক ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। এটি কেবল একটি সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; বরং স্বাস্থ্যকে মানবসম্পদ উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার একটি সুস্পষ্ট বার্তা। একই সঙ্গে এ সরকার স্বাস্থ্যকে আর শুধু একটি সামাজিক সেবা খাত হিসেবে নয়, বরং একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত হিসেবেও দেখছে। আধুনিক হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা, ওষুধ শিল্প, চিকিৎসা প্রযুক্তি, ডিজিটাল স্বাস্থ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেল ডিভাইস, স্বাস্থ্যশিক্ষা, গবেষণা এবং চিকিৎসা পর্যটনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য উদ্যোক্তা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এ দৃষ্টিভঙ্গি সর্বাধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ধারাবাহিক ব্যবহার নিশ্চিত করবে, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করবে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে আরো টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলতে সহায়তা করবে।
স্বাস্থ্যকর্মী ও সেবাগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা: চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ সব স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্বাস্থ্যসেবাগ্রহণকারী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও সরকার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের শৃঙ্খলাহীনতা, সেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষ, জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং হাসপাতালভিত্তিক সহিংসতার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একধরনের অবিশ্বাসের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের অন্যতম বড় অন্তরায়। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও গ্রহণকারী উভয়ের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত থাকবে, এমন একটি হাসপাতাল সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য কেবল সহিংসতা প্রতিরোধ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করে এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে রোগীরা আস্থার সঙ্গে সেবা গ্রহণ করবেন এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও পেশাদার পরিবেশে জনগণের সেবা দিতে পারবেন।
স্বাস্থ্য খাতের মানবসম্পদ: সরকার স্বাস্থ্য খাতের মানবসম্পদ পরিস্থিতির একটি বিস্তৃত মূল্যায়ন শুরু করেছে, যাতে বিদ্যমান শূন্যপদ দ্রুত পূরণ, ভবিষ্যৎ জনবল চাহিদা নিরূপণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি করে একটি সুষম, দক্ষ ও আধুনিক স্বাস্থ্যকর্মী বাহিনী গড়ে তোলা যায়। এরই অংশ হিসেবে পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এছাড়া নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে এক লাখ কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, যাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা ও হাসপাতাল পর্যায়ে পরিবারভিত্তিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ মাতৃত্ব, দক্ষ প্রসবসেবা এবং নবজাতকের মানসম্মত পরিচর্যা আরো শক্তিশালী করা যায়।
সরকারের লক্ষ্য শুধু জনবল বৃদ্ধি নয়; বরং দেশের প্রতিটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনভিত্তিক ও ন্যায্য জনবল বণ্টন নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মান উন্নত করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং একটি আধুনিক ও দলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ বিনিয়োগ একদিকে যেমন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সেবার গুণগত মান উন্নত করবে। অন্যদিকে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিশেষ করে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
হাসপাতাল সেবায় নতুন গতি: বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোয় বহুদিন ধরে অবহেলিত চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং অন্যান্য তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে কঠিন ও তরল চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নের অংশ হিসেবে বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ সর্বমোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজলভ্য হবে। এছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালুর কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাস থেকেই এ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে জনগণের জন্য উন্মুক্ত হবে, ফলে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা আরো সহজলভ্য হবে এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে ৫০০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ধাপে ধাপে ৩০-৫০ শয্যার হাসপাতাল থেকে ১০০ বা ততোধিক শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালে উন্নীত করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব হাসপাতালে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিভ্রাট মোকাবেলা এবং পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন হাসপাতাল’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের প্রতিটি হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন মেডিকেল অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা: স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী সংস্কার হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুনর্গঠন। সরকারের লক্ষ্য দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহুরে ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা। এ ইউনিটগুলো হবে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় প্রবেশের প্রথম দ্বার। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়মিতভাবে পরিবারভিত্তিক সেবা প্রদান করবেন, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং, মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। যাদের চিকিৎসার প্রয়োজন হবে, তাদের স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে রেফার করা হবে। এ মডেল বাংলাদেশকে চিকিৎসাকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করবে।
জরুরি চিকিৎসা: বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ও আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জরুরি রোগী পরিবহন আরো দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত হবে, ফলে দুর্ঘটনা, প্রসূতি জরুরি অবস্থা এবং অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী পরিস্থিতিতে সময়মতো চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সহজ হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক অ্যাম্বুলেন্স ডিজাইনের দায়িত্ব দিয়েছে।
আইনি সংস্কার: স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার চিকিৎসা অবহেলা, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মাননিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। এর মাধ্যমে রোগীর অধিকার সুরক্ষিত হবে, একই সঙ্গে সৎ ও দক্ষ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাদানকারীরাও অযথা হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাবেন।
বিশেষায়িত চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব
বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে সরকার এরই মধ্যে চারটি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বভিত্তিক (পিপিপি) উদ্যোগ শুরু করেছে। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সরকার পর্যায়ক্রমে একটি কৌশলগত ক্রয় (স্ট্র্যাটেজিক পারচেজিং) ব্যবস্থা গড়ে তুলবে, যার মাধ্যমে নির্ধারিত বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা স্বীকৃত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সরকারি অর্থায়নে ক্রয় করা হবে। ফলে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ব্যয়বহুল বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় (ক্যাটাস্ট্রফিক হেলথ এক্সপেনডিচার) থেকে সুরক্ষা পাবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে আর্থিক কারণে বঞ্চিত হবে না। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলবে, যেখানে সেবার প্যাকেজ নির্ধারণ, হাসপাতাল স্বীকৃতি, চুক্তি ও অর্থপ্রদান ব্যবস্থা, রেফারেল প্রক্রিয়া, মাননিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকবে। এ মডেল সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে উন্নতমানের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেশের আরো বেশি মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে, সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে, স্বাস্থ্য খাতে সম্পদের আরো দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং বিদেশে চিকিৎসার জন্য ব্যয় হওয়া বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।
পরিশেষে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাস তাই কেবল কয়েকটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ইতিহাস নয়; এটি একটি নতুন স্বাস্থ্যদর্শনের সূচনা। এমন একটি দর্শন, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা একটি মৌলিক অধিকার; যেখানে প্রতিরোধ চিকিৎসার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়; যেখানে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমে আসে; যেখানে চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিরাপদ পরিবেশে কাজ করেন; যেখানে নারীর কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, সবুজ অবকাঠামো, সুশাসন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব একসঙ্গে একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নির্মাণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের এ যাত্রা এখনো শুরু মাত্র। যদি এ গতি, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রতিরোধভিত্তিক এবং জনকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
জাকির হোসেন,
সম্পাদক, সিটিনিউজ সেভেন ডটকম


