বিশ্বাসে চিড় ইসলামী ব্যাংকিং কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে
জুলাই ৯, ২০২৬
বৃষ্টিতে বিপর্যয়
জুলাই ৯, ২০২৬
বিশ্বাসে চিড় ইসলামী ব্যাংকিং কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে
জুলাই ৯, ২০২৬
বৃষ্টিতে বিপর্যয়
জুলাই ৯, ২০২৬

টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম অঞ্চল পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদরাসার আট শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মৃত্যু

টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চল। এতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বাড়ছে প্রাণহানি।

সর্বশেষ গতকাল কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ‘এ-থ্রি’ ব্লকে একটি মাদরাসায় পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতজনই ওই মাদরাসার শিক্ষার্থী। আরেকজন ওই মাদরাসার শিক্ষক। গতকাল বেলা আড়াইটার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই দিন চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিহতদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে পাঁচজনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলো শাহিদা (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), ওমাইচা বিবি (১৩) ও রাশিদা (১৬)। আহত হয়েছে আসরা (৯), বেগম জান (১৫), ফারেসা বিবি (১২), জান্নাত আরা বিবি (৮), নূর ফাতেমা (১০), নুর সেহেরা (১২), আব্দুল মোনাফ (১৭) ও নূর কায়েস (১০)। তাদের মধ্যে কয়েকজন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, জিকে হাসপাতাল ও ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, পাহাড়ধসের পর উদ্ধার হওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি পাঁচজনকে ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ সাদেক জানান, ঘটনাস্থলে মেয়েদের একটি মাদরাসা এবং তার ওপর একটি মক্তব ছিল। মাটি ভরাট করে নির্মিত মাদরাসাটির পাশের পাহাড় টানা বৃষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পাহাড়ের ঢাল ধসে ভবনটির ওপর পড়ে এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত আটজনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানতে পেরেছি। উদ্ধারকাজ চলছে, তবে হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে।’ এ ঘটনায় আরো পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

একই দিন চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নগরীর পাঁচলাইশ থানার চশমাহিল এলাকায় সুমাইয়া আক্তার নামে ১১ বছরের এক শিশু মারা গেছে। দুর্ঘটনার সময় ঘরে থাকা সুমাইয়ার মা-বাবা বের হয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে পাশের কক্ষে থাকা সুমাইয়া বের হতে পারেনি। ফলে ঘটনাস্থলেই সুমাইয়া মারা যায়।

অন্যদিকে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে আশরাফুল ইসলাম তানভীর নামের ১০ মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তানভীর ওই এলাকার বাগানবাড়ির বাসিন্দা মহিন উদ্দীনের ছেলে। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের কিনারে থাকা ঘরের ওপর মাটি ধসে পড়ে। এ সময় শিশুটি গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও তার মৃত্যু হয়।

এ নিয়ে ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনায় তিনদিনে মোট ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায়। এছাড়া চট্টগ্রামে মোট চারজন, রাঙ্গামাটিতে একজনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে প্রাণহানির সংখ্যা আরো বাড়ার শঙ্কা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

টানা বৃষ্টিপাতে বিপর্যস্ত চট্টগ্রামে রেল যোগাযোগও ব্যাহত হয়েছে। রেললাইনে সীমার অতিরিক্ত পানি উঠে যাওয়ায় চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের ট্রেন চলাচল বন্ধ করা হয়েছে। পাহাড়তলী-ফৌজদারহাট সেকশনের বিভিন্ন অংশে পানি থাকায় ট্রেন চলাচলে অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণাদেশ ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার করেছে রেল প্রশাসন। মঙ্গলবার দুপুর থেকে ঢাকা-কক্সবাজারমুখী একটি ট্রেন আটকে যায়। পরে ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করা হয়।এছাড়া কক্সবাজার থেকে ছেড়ে আসা প্রবাল এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম স্টেশনে আসতে না পারায় সেটি জান আলী হাট স্টেশনে যাত্রা শেষ করে।

গতকাল সকালে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া রেলপথ পরিদর্শন করতে চট্টগ্রামে আসেন।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরী ও ১৫টি উপজেলায় বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের ৫০ শতাংশের অধিক এলাকায় কয়েকদিন ধরে জলমগ্ন রয়েছে। হাঁটু পানি থেকে বুক পর্যন্ত পানি থাকায় স্বাভাবিক নাগরিক জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পাঁচ জেলার গতকালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরে থাকা ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসরত বাসিন্দাদের নিরাপত্তায় আটটি আশ্রয় কেন্দ্র ঘোষণা করেছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাবার সরবরাহ ছাড়াও আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ২৪ ঘণ্টা তৎপর রয়েছে সিটি করপোরেশন।’

এদিকে চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরে পাহাড়ধসে মৃত্যুঝুঁকি এড়াতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উদ্যোগে নগরীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও ছয়টি আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে। আশ্রয় কেন্দ্রে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খাবারসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চসিকের সচিব মো. আশরাফুল আমিন।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে নগরীর পাশাপাশি উপজেলা শহরের মধ্যে বোয়ালখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, সন্দ্বীপ, চন্দনাইশ, হাটহাজারীসহ বেশির ভাগ উপজেলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টিপাতে বিভিন্ন সড়ক ও এলাকা প্লাবিত হওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ কারণে রাঙ্গামাটির সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে ছয় শতাধিক পর্যটক আটকে পড়েছেন। একইভাবে বান্দরবানের দুর্গম নাফাখুমসহ বেশ কয়েকটি পর্যটন স্পটে পর্যটকরা আটকে পড়েছেন। যদিও মঙ্গলবার সেনাবাহিনীসহ স্থানীয় পর্যটক গাইডদের সহায়তায় অনেক আটকে পড়া পর্যটককে নিরাপদে থানচিতে নিয়ে আসা হয়েছে। এরই মধ্যে সাজেকসহ পার্বত্য এলাকায় পর্যটকদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এছাড়া চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের বিভিন্ন প্রান্তে সড়কের ওপর পাহাড়ধস, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কের সাতকানিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলা অংশে পাহাড়ধস ও পানিতে সড়ক ডুবে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বান্দরবানের আলীকদম ও লামা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস এবং সড়ক ও লোকালয়ে পানি উঠে যাওয়ায় মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানে গত পাঁচদিনের ভারি-মাঝারি ও হালকা বৃষ্টিতে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়ক তলিয়ে যাওয়া ও সড়কবেষ্টিত পাহাড় ভাঙন ও ধসের ফলে জেলা ও উপজেলা সদরের সঙ্গে ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় সরাসরি যোগাযোগেও ব্যাঘাত ঘটেছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানকারীদের জরুরি ত্রাণ হিসেবে মোমবাতি, গ্যাস লাইট, খাবার স্যালাইন, লবণ, চিড়া, মুড়ি, চাল, আলু, মসুর ডাল, বিস্কুটসহ প্রয়োজনীয় খাদ্য ও সামগ্রী বিতরণ করেছে প্রশাসন। জেলার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১০ ও ১১ জুলাই জেলা প্রশাসনে কর্মরত চাকরিজীবীদের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিলের অফিস আদেশ দিয়েছেন বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস।

এদিকে টানা বর্ষণে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিকূল আবহাওয়া আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুতসহ পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা রাখা হয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সেখানে কাজ করছেন। কক্সবাজারে আসা ও আটকে থাকা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও যেকোনো ধরনের সহযোগিতার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *