
উদ্বোধনের আগেই রাবির ১০ তলা হলে ফাটল
জুন ১, ২০২৬
রংপুরে অ্যালকোহল পানে ৩ জনের মৃত্যু
জুন ২, ২০২৬
ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে গতকাল দিনভর রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
শরিয়াহভিত্তিক দেশের বৃহত্তম ব্যাংকটির গ্রাহক ফোরাম এ বিক্ষোভের আয়োজন করে। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে এদিন সকালেই সাউন্ড গ্রেনেড, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামানের পানি নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে অন্তত ১৫ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এদিকে দিনভর চলা এ বিক্ষোভের মধ্যে গতকাল সারা দেশে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখা থেকে আমানত তুলে নেয়ার বাড়তি চাপ লক্ষ করা গেছে।
গত ২৪ মে ঈদুল আজহার ছুটি শুরুর আগের শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. জোবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিন পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওমর ফারুক খানও। ওইদিন রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ নিয়ে ওইদিন থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনেকে তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যায়িত করেন। ওই সময় কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগে করেছিলেন।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর ঈদের ছুটির মাঝেই দেশব্যাপী বিভিন্ন স্থানে তার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে গ্রাহকরা বিক্ষোভ করেন বলে জানা গেছে। ছুটির পর গতকাল প্রথম কার্যদিবসে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চেয়ারম্যানের যোগদান ও পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে একদল বিক্ষোভকারী দিনভর মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। এ কারণে মো. খুরশীদ আলম ব্যাংকে প্রবেশ করতে পারেননি। এছাড়া পর্ষদ সভা যাতে অনুষ্ঠিত না হয়, সেজন্য বোর্ডরুমেও তালা লাগিয়ে দেন ব্যাংকটির বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একপর্যায়ে অনলাইনে পর্ষদ সভা আয়োজন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমতি নেয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত রাত ৯টার পর অনলাইনে পরিচালনা পর্ষদের সভা করেছেন ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলম। সভায় ব্যাংকটির বাকি চার পরিচালক উপস্থিত ছিলেন। তবে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কেউ ওই সভায় অংশ নেননি বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সালাম গতকাল রাতে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নতুন চেয়ারম্যান রাত ৯টার দিকে ফোন করে মিটিংয়ে যুক্ত হতে বলেছেন। অনলাইনের ওই সভায় বাকি পরিচালকরাও অংশ নিয়েছেন। সভায় এমডি মো. ওমর ফারুক খানের জমা দেয়া পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে এএমডি আলতাফ হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’
পর্ষদ সভায় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কেউ অংশ নিয়েছিলেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘নতুন চেয়ারম্যান তাদের ফোন দিয়েছিলেন। কিন্তু কাউকে পাননি বলে আমাদের জানিয়েছেন।’
প্রসঙ্গত, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ পর্ষদে নিযুক্ত পাঁচ পরিচালককেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এদিকে গতকাল দিনের শুরুতেই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামানের পানি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এ সময় অন্তত ১৫ জন আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। গ্রাহক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী ব্যাংকের লোকাল অফিসের গ্রাহক আতিকুর রহমান (৫০), প্রিন্সিপাল শাখার গ্রাহক মিকাইল ইসলাম (৪২), আগারগাঁও শাখার রেজাউল করিম (৩৫), ধানমন্ডি শাখার ইকবাল হোসেন (৬০), ফার্মগেট শাখার হাবিবুর রহমান (৪৬), বংশাল শাখার নূর মোহাম্মদ (৩১) প্রমুখ। আহতরা রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানানো হয়েছে।
পুলিশি বাধার মুখে শুরুতে পণ্ড হলেও দুপুর ১২টার দিকে আবারো ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ আয়োজন করেন বিক্ষোভকারীরা। সমাবেশে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুরুন নবি মানিক বলেন, ‘নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি আগের এমডি ওমর ফারুককে ফিরিয়ে আনতে হবে।’
এদিকে ইসলামী ব্যাংক ঘিরে দিনভর এসব উত্তেজনায় ব্যাংকটির সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শাখায় আমানত তুলতে অনেক গ্রাহককে ভিড় জমাতে দেখা গেছে। অনেক শাখায় গ্রাহকদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে ব্যাংক কর্মকর্তাদের। মিরপুর শাখার গ্রাহক খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘ইসলামী”ব্যাংক নিয়ে কিছুদিন ধরেই নানা কথা শুনছি। আজকে টিভিতে দেখলাম চরম ঝামেলা হচ্ছে। কষ্টার্জিত টাকা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে টাকা তুলে নিতে এসেছি। প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে টাকা তুলতে বেগ পেতে হয়েছে।’
একই চিত্র দেখা গেছে কারওয়ান বাজার, বনশ্রী, বাসাবোসহ বিভিন্ন শাখায়। সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাহকদের অনেকেই তাদের মেয়াদি আমানতের টাকা তুলে নেয়ার জন্য কাউন্টারে ভিড় করেন। ফলে নগদ টাকার চাহিদা হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিছু কিছু শাখায় তারল্য ব্যবস্থাপনায়ও হিমশিম খেতে হয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের।
এদিকে আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিল করা হবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো সিদ্ধান্তই রাস্তার আন্দোলনে পরিবর্তন হবে না। কোনো ব্যাংক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘যেকোনো ইস্যুতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিক্ষোভ প্রদর্শন বা মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেয়ারও এখতিয়ার আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক আবেগ বা চাপের ঊর্ধ্বে থেকে কেবল প্রতিষ্ঠানের জন্য যা উপযুক্ত এবং আইনগতভাবে সিদ্ধ, সে অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেবে।’
প্রসঙ্গত, দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত ইসলামী ব্যাংকের মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ এখন ২ লাখ ৩৭ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে গত বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটিতে গ্রাহকদের ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকার আমানত জমা ছিল। বিপরীতে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ (ঋণ) করেছে ব্যাংকটি। বিতরণকৃত এ ঋণের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই এখন খেলাপি। ব্যাংকটি থেকে কেবল এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান দেয়া ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা এখন তিন কোটিরও বেশি।


