ক্রেতা না পেয়ে নদী-খালে ফেলে দেয়া হয় কোরবানির শত শত পশুর চামড়া
মে ৩১, ২০২৬
ঈদ শেষে রাজধানীতে ফিরছেন কর্মজীবী মানুষ ঢাকাও ছাড়ছেন অনেকে
মে ৩১, ২০২৬
ক্রেতা না পেয়ে নদী-খালে ফেলে দেয়া হয় কোরবানির শত শত পশুর চামড়া
মে ৩১, ২০২৬
ঈদ শেষে রাজধানীতে ফিরছেন কর্মজীবী মানুষ ঢাকাও ছাড়ছেন অনেকে
মে ৩১, ২০২৬

চাহিদা মেটাতে ইউরিয়া আমদানি

দরপত্রে কাঙ্ক্ষিত সাড়া মেলেনি, রাশিয়া থেকে সরাসরি সার কিনছে বিসিআইসি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে ইউরিয়া সার আমদানি নিয়ে বিপাকে পড়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।

বেসরকারিভাবে দরপত্রের মাধ্যমে চার লাখ টন সার আমদানির জন্য তিনটি বিজ্ঞপ্তি দিলে মাত্র সোয়া লাখ টন সরবরাহের সাড়া মিলেছে। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি এখন সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথডে (ডিপিএম) ইউরিয়া আমদানি করতে চায়। এরই মধ্যে রাশিয়া থেকে এক লাখ টন সার আমদানির জন্য সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে প্রস্তাবও পাঠিয়েছে।

সাধারণত সরকারি কোনো সংস্থা কিছু কিনতে বা আমদানি করতে চাইলে দরপত্র আহ্বানের বিধান রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় আইন ২০০৬-এর ৬৮(১) ধারায় জরুরি জাতীয় প্রয়োজন বা দুর্যোগকালীন পরিস্থিতিতে বিশেষ পদ্ধতিতে ক্রয়েরও সুযোগ রয়েছে। ধারাটিতে বলা আছে, সরকার যদি কোনো জরুরি জাতীয় প্রয়োজন (আর্জেন্ট ন্যাশনাল নিড) বা বিপর্যয়কর পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জনস্বার্থে প্রয়োজন মনে করে, তাহলে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা আইনসম্মত অন্য কোনো পদ্ধতিতে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, মূলত ৬৮(১) ধারার আলোকে রাশিয়া থেকে এক লাখ টন ইউরিয়া আমদানি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ঈদের আগেই মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইউরিয়া দুবাইভিত্তিক কোম্পানি তাদের স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে সার সরবরাহ করবে। রাশিয়া দূতাবাসের মাধ্যমে সার আমদানির কাজটি এগিয়েছে। ডিপিএমে কিনলেও জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) চুক্তির মতো ফর্মুলা প্রাইজে তারা সরবরাহ করবে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাশিয়া থেকে ডিপিএমে এক লাখ টন সার আমদানির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার ওই প্রতিষ্ঠান তিন লাখ টন ইউরিয়া সরবরাহ করতে আগ্রহী। আমরা প্রাথমিকভাবে এক লাখ টন আনার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। তারা ফর্মুলা প্রাইজে সরবরাহ করবে। আশা করছি, এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।’

জানা গেছে, বিসিআইসি জিটুজি চুক্তিতে ইউরিয়া আমদানি করে থাকে। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইউরিয়া আমদানি করতে না পেরে বেসরকারিভাবে বিকল্প উৎস থেকেও সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি। তারই অংশ হিসেবে চার লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানির জন্য দুই দফা তিনটি (একটি পুনঃবিজ্ঞপ্তি) দরপত্র আহ্বান করেছিল। তবে সেখানে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার টন সরবরাহের বিষয়ে আশ্বাস মিলেছে। এখন চতুর্থবারের মতো দরপত্র আহ্বানের পথে হাঁটছে বিসিআইসি। সংস্থাটির একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তারা জানিয়েছেন।

বিসিআইসি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রথম দফায় দুই লাখ টন ইউরিয়া আমদানির দরপত্র আহ্বান করলেও সেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানই অংশ নেয়নি। দ্বিতীয় দফায় আবার দুই লাখ টন আমদানির দরপত্র আহ্বান করে ৫০ হাজার টন সরবরাহের বিষয়ে দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়। এরপর প্রথম দরপত্রটির বিপরীতে পুনঃদরপত্র বিজ্ঞপ্তি দিলে আরো ৭৫ হাজার টন সরবরাহের আশ্বাস মেলে। অর্থাৎ চার লাখ টনের দরপত্রে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার টনের সরবরাহকারী মিলেছে। এখন নতুন দফায় দরপত্রের কথা ভাবছে বিসিআইসি। তবে সংস্থাটির পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলছেন, ‘এ মুহূর্তে পুনঃদরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা নেই।’

আমদানি ও দরপত্রের বিষয়ে জানেন বিসিআইসির এমন এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরনো বিভিন্ন উৎসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। চার লাখ টন আমদানির যে দরপত্র হয়েছিল, সেটির পুনঃদরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেয়ার বিষয়েও ভাবনা চলছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

বাংলাদেশের ইউরিয়ার বড় জোগানদাতা চীন, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কাতার থেকেও ইউরিয়া কেনা হয়। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসনের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সার আমদানি নিয়ে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সংকট কাটাতে পুরনো উৎস চীনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ইউরিয়া আমদানির চেষ্টা করছে বিসিআইসি। পাশাপাশি নতুন উৎসও খোঁজ করে। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে বলে জানায় বিসিআইসি।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে আগামী অর্থবছরে ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে ২৬ লাখ ২২ হাজার টন। নিরাপত্তার জন্য মজুদ হিসেবে আরো পাঁচ লাখ টন মিলিয়ে ইউরিয়া প্রয়োজন ৩১ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে আগামী জুলাই-আগস্টে শুরু হতে যাওয়া আমন মৌসুমের জন্য ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন। গত ২৪ মে পর্যন্ত দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এ সার মজুদ ছিল ৩ লাখ ৯৮ হাজার টনের মতো, যেখানে চার লাখ টনকে ন্যূনতম নিরাপদ মজুদসীমা ধরা হয়।

বিসিআইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, অল্প অল্প আমদানি হলেও সারের সংকট হবে না। চালু থাকা তিনটি কারখানায় দৈনিক পাঁচ হাজার টনের মতো ইউরিয়া উৎপাদন হচ্ছে। তা দিয়ে আমনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে আগামী শীতকালীন মৌসুমকে লক্ষ্য রেখে তারা আমদানির মাধ্যমে মজুদ বাড়াতে চাচ্ছেন। তাদের দাবি, আগামী সেপ্টেম্বর শেষে চাহিদা মিটিয়েও ছয় লাখ টনের মতো মজুদ থাকবে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একসময় চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ ইউরিয়া বিসিআইসি উৎপাদন করত। তবে এখন চাহিদার ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই আমদানি করা হয়। বৈশ্বিক এ সংকটের কারণে আমদানি কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই।

বিসিআইসির ওয়েবসাইটের তথ্যমতে, সংস্থাটির অধীনে পরিচালিত পাঁচটি ইউরিয়া কারখানার বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩১ লাখ ৫৫ হাজার টন। তবে বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, বেশির ভাগ কারখানার বয়স হওয়ায় পুরোদমে উৎপাদন চালানো সম্ভব না। তবে পর্যাপ্ত জ্বালানি পেলে বছরে ২০ লাখ টনের বেশি ইউরিয়া উৎপাদন করা সম্ভব।

জানা গেছে, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে ইউরিয়া আমদানির চেষ্টা করছে বিসিআইসি। এর অংশ হিসেবে সৌদি আরব থেকে ২২ হাজার টন ইউরিয়া নিয়ে একটি জাহাজ ভূমধ্যসাগর হয়ে বাংলাদেশের পথে রয়েছে। আগামী ৫ জুন জাহাজটির বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এজন্য অবশ্য খরচও বেড়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য যেসব ইউরিয়া আমদানি হবে, সেখানেও ব্যয় বাড়ছে। এ বিষয়ে আগামী অর্থবছরের আমদানিতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় ব্যয় বেশি হবে বলে জানিয়েছে বিসিআইসি। তবে সার যখন কেনা হয়, তখনকার আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী দাম নির্ধারণ হওয়ায় আগামী অর্থবছরে কী পরিমাণ ব্যয় বাড়বে সেটি নিশ্চিত নয় বিসিআইসি।

এ বিষয়ে বিসিআইসির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মো. গোলাম ফারুকের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে সারের দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। ফলে আগামী অর্থবছরের জন্য যে ইউরিয়া কেনা হবে তার জন্য আগের বছরের তুলনায় ব্যয়ও বাড়বে। তবে কী পরিমাণ বাড়বে সেটি এখন বলা সম্ভব না। আগামী অর্থবছরে ইউরিয়া আমদানিতে কেমন বাজেট লাগতে পারে সে বিষয়ে গত বছরের অক্টোবরের দিকে হিসাব চাওয়া হয়েছিল। তখন আমরা চলতি অর্থবছরের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি প্রক্ষেপণ করেছিলাম। এখন বৈশ্বিক বাজারে অনেক দাম বেড়েছে। ফলে নিশ্চিতভাবে ব্যয়ও বাড়বে। ব্যয়ের বিষয়টি রিভাইস বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে।’

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা থাকায় সরবরাহকারী কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে নিজেদের প্রয়োজনে অনেক দেশ সার বিক্রি কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক সংকটের কারণে সার পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ আছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো সমাধান—দেশেই উৎপাদন বাড়ানো। এছাড়া হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে আনা যাবে এমন উৎস খুঁজে সেখান থেকে পেলে আমদানি করতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *